জন্ম থেকে ওফাত—এক মহামানবের জীবনের আলোকে মানবতার পথচলা

মুহাম্মদ ﷺ : মানবতার মুক্তির দূত ও বিভক্ত মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের আহ্বান

মোঃ আবদুল লতিফ   প্রিন্ট
মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬   সর্বশেষ আপডেট : 10:12 pm

মুহাম্মদ ﷺ : মানবতার মুক্তির দূত ও বিভক্ত মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের আহ্বান

পৃথিবীর ইতিহাসে অসংখ্য মানুষ জন্মেছেন, রাজা-বাদশাহ এসেছেন, দার্শনিক ও বিজেতারা তাঁদের কীর্তির স্বাক্ষর রেখে গেছেন। কিন্তু এমন একজন মানুষ পৃথিবীতে এসেছেন, যাঁর জীবন কেবল একটি জাতি, একটি ভূখণ্ড কিংবা একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নয়—বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য অনুকরণীয় আদর্শ। তিনি মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
তিনি এসেছিলেন এমন এক সময়ে, যখন আরব সমাজে অজ্ঞতা, গোত্রীয় হিংসা, অন্যায়, সুদ, মদ, জুয়া, নারী-অবমাননা ও দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা। সেই অন্ধকারের মধ্যে তিনি জ্বালিয়েছিলেন তাওহিদ, ন্যায়, মানবতা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও নৈতিকতার প্রদীপ।
তাঁর জন্মের মধ্য দিয়ে যেন মরুর বুকে একটি নতুন সূর্যের উদয় হয়েছিল; আর তাঁর ৬৩ বছরের জীবন মানবসভ্যতার ইতিহাসে রেখে গেছে এমন এক আলোকবর্তিকা, যার আলো আজও নিভে যায়নি।
জন্ম ও বংশপরিচয়
মহানবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ মক্কার সম্মানিত কুরাইশ বংশের বনু হাশিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব এবং মাতা আমিনা বিনতে ওহাব। তিনি পিতার মৃত্যুর পর পৃথিবীতে আগমন করেন। তাঁর বংশধারা হযরত ইসমাইল (আ.)-এর মাধ্যমে হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত।
তাঁর জন্মের সঠিক দিন নিয়ে ঐতিহাসিক ও সীরাতবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে রবিউল আউয়াল মাসে তাঁর জন্ম এবং সোমবার জন্মগ্রহণের বিষয়টি ঐতিহাসিক বর্ণনায় সুপরিচিত। তাঁর ওফাতের দিন ছিল সোমবার; ১২ রবিউল আউয়াল তাঁর ওফাতের সর্বাধিক প্রচলিত তারিখ।
শৈশব ও বাল্যকাল
আরবের তৎকালীন রীতি অনুযায়ী শিশুকে বিশুদ্ধ আরবি ভাষা ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশে লালন-পালনের জন্য মরু অঞ্চলের দুধমায়ের কাছে দেওয়া হতো। মহানবী ﷺ-কে লালন-পালনের সৌভাগ্য লাভ করেন হযরত হালিমা সাদিয়া (রা.)। তাঁর সান্নিধ্যে মহানবীর শৈশবের গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিবাহিত হয়।
ছয় বছর বয়সে তিনি মাতৃহারা হন। এরপর তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিব তাঁকে স্নেহে লালন করেন। দাদার মৃত্যুর পর তাঁর চাচা আবু তালিব তাঁর অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেন।
এতিম জীবনের বেদনা তাঁর হৃদয়কে দুর্বল করেনি; বরং পৃথিবীর এতিম, অসহায় ও নিপীড়িত মানুষের প্রতি তাঁর হৃদয়কে আরও কোমল করে তুলেছিল। পরবর্তীকালে কুরআনও তাঁকে তাঁর এতিম জীবনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে—
“তিনি কি তোমাকে এতিম অবস্থায় পাননি? অতঃপর আশ্রয় দিয়েছেন।”
—সূরা আদ-দুহা: ৬
ফুজ্জারের যুদ্ধ ও ন্যায়বোধের সূচনা
নবুওয়াত লাভের বহু আগে আরবের গোত্রগুলোর মধ্যে সংঘটিত হয় ফুজ্জারের যুদ্ধ। কিশোর মুহাম্মদ ﷺ সেই সময় তাঁর চাচাদের সঙ্গে ছিলেন। ঐতিহাসিক বর্ণনায় তাঁর ভূমিকা ছিল মূলত চাচাদের সহযোগিতা করা এবং যুদ্ধক্ষেত্রে তীর সংগ্রহ করে দেওয়ার মতো সহায়তামূলক কাজ।
এই ঘটনা তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আমাদের সামনে তুলে ধরে—তিনি এমন এক সমাজে বেড়ে উঠেছিলেন, যেখানে গোত্রীয় সংঘাত ছিল স্বাভাবিক; কিন্তু তাঁর অন্তর ছিল ন্যায় ও শান্তির প্রতি আকৃষ্ট।
হিলফুল ফুজুল : ন্যায়ের পক্ষে এক ঐতিহাসিক অঙ্গীকার
ফুজ্জারের যুদ্ধের পর মক্কার সামাজিক অস্থিরতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কিছু বিবেকবান মানুষ একটি মানবিক চুক্তি গঠন করেন, যা ইতিহাসে হিলফুল ফুজুল নামে পরিচিত। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল—কোনো ব্যক্তি, সে মক্কার অধিবাসী হোক কিংবা বহিরাগত, জুলুমের শিকার হলে তার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া।
একজন বহিরাগত ব্যবসায়ীর ওপর অন্যায়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই ন্যায়ভিত্তিক উদ্যোগ শক্তিশালী হয়। মহানবী ﷺ নবুওয়াতের আগেই এই অঙ্গীকারে অংশগ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে নবুওয়াত লাভের পরও তিনি এই ন্যায়ভিত্তিক চুক্তির প্রশংসা করেছিলেন।
এখানেই আমরা দেখতে পাই—নবুওয়াত লাভের আগেই মুহাম্মদ ﷺ অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।
কাবা সংস্কার ও হাজরে আসওয়াদ স্থাপনের বিরোধ মীমাংসা
মহানবী ﷺ-এর বয়স যখন প্রায় ৩৫ বছর, তখন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কাবাঘর পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেয় কুরাইশ। নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে পৌঁছালে হাজরে আসওয়াদ যথাস্থানে স্থাপন করার সম্মান নিয়ে গোত্রগুলোর মধ্যে তীব্র বিরোধ সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, সামান্য কারণে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শুরু হয়ে যেতে পারত।
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হলো—যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম কাবার প্রাঙ্গণে প্রবেশ করবেন, তিনিই বিরোধের মীমাংসা করবেন। সেই ব্যক্তি ছিলেন মুহাম্মদ ﷺ।
তিনি একটি চাদর বিছিয়ে তার ওপর হাজরে আসওয়াদ রাখলেন এবং বিভিন্ন গোত্রের নেতাদের চাদরের চার কোণ ধরতে বললেন। তাঁরা পাথরটি নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে গেলে মহানবী ﷺ নিজ হাতে সেটি স্থাপন করলেন। এভাবে তাঁর প্রজ্ঞা একটি সম্ভাব্য রক্তক্ষয়ী সংঘাতকে শান্তিতে পরিণত করল।
ব্যবসায় আত্মনিয়োগ ও ‘আল-আমিন’ উপাধি
মহানবী ﷺ তরুণ বয়সে ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করেন। সততা, আমানতদারি, ন্যায়পরায়ণতা ও উত্তম চরিত্রের কারণে তিনি মক্কাবাসীর কাছে ‘আল-আমিন’—বিশ্বস্ত এবং ‘আস-সাদিক’—সত্যবাদী হিসেবে পরিচিত হন।
ব্যবসা তাঁর কাছে শুধু অর্থ উপার্জনের মাধ্যম ছিল না; বরং সততা ও নৈতিকতার পরীক্ষাক্ষেত্র ছিল। তিনি প্রমাণ করেছিলেন—বাণিজ্যে লাভের চেয়ে বিশ্বাসের মূল্য অনেক বেশি।
খাদিজা (রা.)-এর সঙ্গে বিবাহ
মহানবী ﷺ-এর সততা ও চরিত্রে মুগ্ধ হয়ে সম্মানিত ব্যবসায়ী হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহা তাঁর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এই বিবাহ ছিল ভালোবাসা, বিশ্বাস, সহযোগিতা ও পারস্পরিক সম্মানের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
নবুওয়াতের কঠিন দিনগুলোতে হযরত খাদিজা (রা.) ছিলেন তাঁর সবচেয়ে বড় আশ্রয় ও সমর্থন। প্রথম ওহি নাজিলের পর যখন মহানবী ﷺ উদ্বিগ্ন হয়ে ঘরে ফিরে আসেন, তখন খাদিজা (রা.) তাঁকে সান্ত্বনা দেন এবং তাঁর চরিত্রের মহত্ত্বের ওপর আস্থা প্রকাশ করেন।
নবুওয়াত লাভ : হেরা থেকে মানবতার নতুন সূচনা
মহানবী ﷺ চল্লিশ বছর বয়সে মক্কার অদূরে হেরা গুহায় ধ্যান ও ইবাদতে নিয়োজিত থাকতেন। ৬১০ খ্রিষ্টাব্দে সেখানে ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রথম ওহি নিয়ে উপস্থিত হন—
“পড়ুন, আপনার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।”
—সূরা আলাক: ১
সেদিন থেকেই শুরু হলো মানবজাতির ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়। একজন মানুষ নবী হলেন, একটি জাতি জাগ্রত হলো এবং পৃথিবীর সামনে উন্মোচিত হলো আল্লাহর একত্ব, মানবমর্যাদা, ন্যায় ও আখিরাতের চিরন্তন বার্তা।
নবুওয়াত থেকে হিজরত : নির্যাতন, ধৈর্য ও অবিচল সংগ্রাম
নবুওয়াতের পর মহানবী ﷺ প্রথমে গোপনে এবং পরে প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচার করেন। তাঁর আহ্বান ছিল অত্যন্ত সরল—
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ—আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই।
কিন্তু মক্কার ক্ষমতাবানরা এই আহ্বান মেনে নিতে পারেনি। মুসলমানদের ওপর নির্যাতন শুরু হয়। কেউ প্রহৃত হন, কেউ কারাগারে বন্দি হন, কেউ প্রাণ হারান। বিলাল (রা.)-এর মতো সাহাবিকে উত্তপ্ত বালুর ওপর শুইয়ে নির্যাতন করা হয়। ইয়াসির পরিবার শাহাদাত বরণ করে।
এরপর মুসলমানদের একটি দল আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। হযরত খাদিজা (রা.) ও আবু তালিবের ইন্তেকালের পর মহানবী ﷺ-এর ওপর দুঃখ ও বিপদের ভার আরও বেড়ে যায়। তায়েফে গিয়েও তিনি নির্মম নির্যাতনের শিকার হন; কিন্তু প্রতিশোধের বদলে তিনি তাদের হেদায়েতের জন্য দোয়া করেন।
অবশেষে ইয়াসরিবের মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে এবং মদিনায় হিজরতের পথ উন্মুক্ত হয়।
হিজরত : নতুন সভ্যতার সূচনা
মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত শুধু স্থান পরিবর্তনের ঘটনা ছিল না; এটি ছিল বিশ্বাস, আদর্শ ও ন্যায়ভিত্তিক একটি সমাজ প্রতিষ্ঠার সূচনা।
মহানবী ﷺ হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে মদিনার উদ্দেশে যাত্রা করেন। সাওর গুহায় অবস্থানের সেই মুহূর্তে যখন শত্রুরা গুহার মুখে এসে পৌঁছেছিল, তখন মহানবী ﷺ তাঁর সঙ্গীকে বলেছিলেন—
“চিন্তা করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।”
এই একটি বাক্যই যেন হিজরতের সমগ্র দর্শন—সংকট যত গভীর হোক, আল্লাহর ওপর আস্থা হারানো যাবে না।
মাদানি জীবন : রাষ্ট্র, সমাজ ও মানবতার নতুন বিন্যাস
মদিনায় পৌঁছে মহানবী ﷺ প্রথমে মসজিদ নির্মাণ করেন। এরপর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। বিভিন্ন ধর্ম ও গোত্রের মানুষের মধ্যে সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য মদিনার সনদ প্রণয়ন করেন।
বদর, উহুদ, খন্দকসহ বিভিন্ন যুদ্ধের মধ্য দিয়ে মুসলিম সমাজকে টিকে থাকার সংগ্রাম করতে হয়। কিন্তু যুদ্ধের মাঝেও মহানবী ﷺ মানবিকতার শিক্ষা ভুলে যাননি।
হুদায়বিয়ার সন্ধি তাঁর দূরদর্শিতার অসাধারণ দৃষ্টান্ত। আপাতদৃষ্টিতে কঠিন শর্ত মেনে নিয়েও তিনি বৃহত্তর শান্তি ও ভবিষ্যতের বিজয়ের পথ তৈরি করেছিলেন।
অবশেষে ৮ হিজরিতে মক্কা বিজয় হলো। যে মক্কাবাসীরা তাঁকে এবং তাঁর অনুসারীদের নির্যাতন করেছিল, তাদের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ তাঁর হাতে এসেছিল। কিন্তু বিজয়ীর আসনে বসেও তিনি ক্ষমার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন।
এটাই মুহাম্মদ ﷺ—ক্ষমতা পেয়েও প্রতিশোধপরায়ণ নন; বিজয়ী হয়েও অহংকারী নন।
বিদায় হজ : মানবতার মহাসনদ
১০ হিজরিতে মহানবী ﷺ বিদায় হজ পালন করেন। আরাফাতের ময়দানে তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ মানবাধিকারের এক অনন্য দলিল।
তিনি মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের মর্যাদা ঘোষণা করেন। সুদপ্রথা বাতিল করেন, নারীর অধিকার ও মর্যাদার কথা বলেন এবং মুসলমানদের পরস্পর ভাই ভাই হিসেবে থাকার শিক্ষা দেন।
তিনি বংশ, গোত্র, জাতি ও শ্রেষ্ঠত্বের অহংকারকে প্রত্যাখ্যান করে তাকওয়াকে মর্যাদার মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
আজ পৃথিবী যখন জাতি, বর্ণ, ভাষা, ভূখণ্ড ও ক্ষমতার অহংকারে বিভক্ত, তখন বিদায় হজের সেই মানবিক ঘোষণা আমাদের জন্য আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।
ইন্তেকাল : পৃথিবীর বুক থেকে বিদায়, হৃদয়ে চিরস্থায়ী উপস্থিতি
বিদায় হজের কয়েক মাস পর মহানবী ﷺ অসুস্থ হন। ১১ হিজরির রবিউল আউয়াল মাসে, সোমবার তিনি মদিনায় ইন্তেকাল করেন। ১২ রবিউল আউয়াল তাঁর ওফাতের সর্বাধিক প্রচলিত তারিখ হিসেবে মুসলিম সমাজে সুপরিচিত।
তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন, কিন্তু তাঁর শিক্ষা বিদায় নেয়নি। তাঁর সুন্নাহ আজও কোটি কোটি মানুষের জীবনকে আলোকিত করছে।
নবী-রাসূলদের আল্লাহ কেন পাঠিয়েছেন?
কোরআনের ভাষায় নবী-রাসূলদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব ছিল মানুষকে সুসংবাদ দেওয়া, সতর্ক করা, সত্যের পথে আহ্বান করা এবং মানুষের মতভেদপূর্ণ বিষয়ে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী সঠিক পথ দেখানো। আল্লাহ বলেন—
“আমি প্রত্যেক জাতির মধ্যে রাসূল পাঠিয়েছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাগুতকে বর্জন করো।”
—সূরা আন-নাহল: ৩৬
অন্যত্র আল্লাহ বলেন, তিনি নবীদের পাঠিয়েছেন সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে এবং মানুষের মধ্যে বিরোধপূর্ণ বিষয়ের সত্য পথনির্দেশের জন্য কিতাব নাজিল করেছেন।
—সূরা আল-বাকারা: ২১৩
অর্থাৎ নবী-রাসূলদের আগমনের মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে এক আল্লাহর দাসত্বে নিয়ে আসা; অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে জ্ঞানের আলোয়, অন্যায় থেকে ন্যায়ে এবং বিভেদ থেকে সত্য ও ভ্রাতৃত্বের পথে নিয়ে যাওয়া।
আজকের মুসলিম বিশ্ব কেন বিভক্ত?
আজ বিশ্বের মুসলমানরা এক কাতারে দাঁড়ালেও বাস্তব জীবনে নানা মত, মাজহাব, চিন্তাধারা, রাজনৈতিক অবস্থান, জাতীয়তা ও আঞ্চলিক পরিচয়ে বিভক্ত।
সুন্নি ও শিয়া—এ দুটি বৃহৎ ঐতিহাসিক ধারার পাশাপাশি সুন্নি মুসলমানদের মধ্যেও হানাফি, শাফেয়ি, মালিকি ও হাম্বলি ফিকহের অনুসারী রয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন ধর্মীয় আন্দোলন, মতাদর্শ, রাজনৈতিক পরিচয়, জাতীয়তাবাদ ও আঞ্চলিক স্বার্থ মুসলিম সমাজকে আরও বিচ্ছিন্ন করেছে।
তবে মতপার্থক্য আর শত্রুতা এক জিনিস নয়। ইসলামী জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে বহু ফিকহি ও ব্যাখ্যাগত মতভেদ ছিল; কিন্তু মতভেদকে যদি বিদ্বেষ, তাকফির, সহিংসতা ও পারস্পরিক অবজ্ঞায় পরিণত করা হয়, তখন তা উম্মাহর শক্তিকে দুর্বল করে।
আজ মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় সংকট শুধু মতের পার্থক্য নয়; বরং মতপার্থক্যকে সহনশীলতার সঙ্গে ধারণ করতে না পারা।
এই বিভক্তি থেকে উত্তরণের পথ
উত্তরণের প্রথম পথ হলো—কুরআন ও রাসুল ﷺ-এর সুন্নাহর মৌলিক শিক্ষায় ফিরে আসা।
দ্বিতীয়ত, ছোটখাটো মতভেদকে বড় করে না দেখে ঈমান, তাওহিদ, সালাত, নৈতিকতা, মানবিকতা, ন্যায় ও ভ্রাতৃত্বের মৌলিক বিষয়গুলোকে সামনে আনতে হবে।
তৃতীয়ত, একে অন্যকে হেয় করার সংস্কৃতি পরিহার করতে হবে। আল্লাহ বলেন—
“তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।”
—সূরা আলে ইমরান: ১০৩
চতুর্থত, মুসলিম সমাজে জ্ঞানচর্চা, যুক্তিবোধ, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং মতের ভিন্নতার মধ্যে সহাবস্থানের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
পঞ্চমত, রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক স্বার্থের ঊর্ধ্বে মানবিকতা ও ন্যায়কে স্থান দিতে হবে। মহানবী ﷺ-এর মক্কা বিজয় আমাদের শেখায়—ক্ষমতা প্রতিশোধের লাইসেন্স নয়; ক্ষমতা হলো ক্ষমা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সুযোগ।
উপসংহার : আসুন, আমরা মুহাম্মদ ﷺ-এর উম্মত হওয়ার মর্যাদা রক্ষা করি
মহানবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ-এর জীবন শুধু জন্ম ও ওফাতের মধ্যবর্তী কিছু ঐতিহাসিক ঘটনার সমষ্টি নয়। তাঁর জীবন একটি পূর্ণাঙ্গ আদর্শ—শৈশবে ধৈর্য, যৌবনে সততা, ব্যবসায় আমানতদারি, পারিবারিক জীবনে ভালোবাসা, সমাজে ন্যায়, রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রজ্ঞা, যুদ্ধে নীতি, বিজয়ে ক্ষমা এবং বিপদে আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা।
তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—মানুষকে জয় করতে হলে হৃদয় জয় করতে হয়; সমাজ পরিবর্তন করতে হলে আগে মানুষের চরিত্র পরিবর্তন করতে হয়; আর উম্মাহকে শক্তিশালী করতে হলে পরস্পরের বিরুদ্ধে নয়, পরস্পরের পাশে দাঁড়াতে হয়।
আজ পবিত্র মিলাদুন্নবী ﷺ-এর এই স্মরণময় মুহূর্তে আমাদের অঙ্গীকার হোক—আমরা শুধু মহানবী ﷺ-এর জন্ম ও ওফাতের কথা স্মরণ করব না; তাঁর আদর্শকে জীবনে ধারণ করব।
আমরা মিথ্যার পরিবর্তে সত্যকে বেছে নেব, অন্যায়ের পরিবর্তে ন্যায়কে, বিদ্বেষের পরিবর্তে ভালোবাসাকে, বিভেদের পরিবর্তে ঐক্যকে এবং প্রতিহিংসার পরিবর্তে ক্ষমাকে স্থান দেব।
মুসলমানের পরিচয় শুধু নামের মধ্যে নয়—চরিত্রে, আচরণে, আমানতদারিতে, মানবিকতায় এবং অন্যের অধিকার রক্ষায়।
আসুন, আমরা কুরআনের সেই আহ্বানে সাড়া দিই—
“তোমরা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।”
আসুন, আমরা মহানবী ﷺ-এর উম্মত হিসেবে এমন একটি সমাজ গড়ে তুলি, যেখানে মানুষ মানুষকে ঘৃণা করবে না; মতের ভিন্নতা শত্রুতায় পরিণত হবে না; শক্তিমান দুর্বলকে পদদলিত করবে না; এবং ধর্ম মানুষের মধ্যে বিভেদের দেয়াল নয়, ন্যায়, শান্তি ও কল্যাণের সেতু হয়ে উঠবে।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন হোক আমাদের পথের আলো, তাঁর সুন্নাহ হোক আমাদের চরিত্রের সৌন্দর্য এবং তাঁর উম্মাহর ঐক্য হোক আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার।
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলা আলিহি ওয়া আসহাবিহি আজমাঈন।

লেখক: মোঃ আবদুল লতিফ
(শিক্ষক ও লেখক)
প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত)
গভ. মডেল গার্লস হাই স্কুল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

Facebook Comments Box

Posted ৯:৫২ পিএম | মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬

The Daily Sarod |