কাজীপাড়ার ছোট গলিতে রঙিন স্বপ্ন: হাতে খড়ি আর্ট একাডেমির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন

অনলাইন ডেস্ক   প্রিন্ট
শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬   সর্বশেষ আপডেট : ৯:২৮ অপরাহ্ণ

কাজীপাড়ার ছোট গলিতে রঙিন স্বপ্ন: হাতে খড়ি আর্ট একাডেমির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের কাজীপাড়ার একটি সরু গলি। একসময় যেখানে ঝগড়া-বিবাদই ছিল নিত্যদিনের চিত্র, সেই জায়গায় গড়ে উঠেছে রঙ, তুলি আর সৃজনশীলতার এক উজ্জ্বল কেন্দ্র। হাতে খড়ি আর্ট একাডেমি। চিত্রশিল্পী মকবুল হোসেন সজীবের স্বপ্ন থেকে জন্ম নেওয়া একটি প্রতিষ্ঠান।
২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই একাডেমিতে বর্তমানে ৫ জন শিক্ষক রয়েছেন, যাদের মধ্যে দুজন জাতীয় পর্যায়ের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী এখানে নিয়মিত চিত্রাঙ্কনের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে এবং ইতোমধ্যে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে নানা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পুরস্কারও অর্জন করেছে।
আজ শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) ছিল প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। দিনটি ঘিরে আয়োজন করা হয় এক বিশেষ চিত্রাঙ্কন কর্মশালা, যেখানে অংশ নেয় বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শতাধিক শিক্ষার্থী। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত চলা এই কর্মশালায় শিশু শ্রেণী থেকে দ্বাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা রঙ-তুলিতে ফুটিয়ে তোলে তাদের কল্পনার জগৎ। কারও কাগজে উঠে আসে গ্রামীণ জনজীবন, কারও ছবিতে ব্যস্ত শহরের কোলাহল, আবার কেউ আঁকে আকাশ, চাঁদ-সূর্যের রহস্যময়তা।
তবে এই কর্মশালায় সবার দৃষ্টি কেড়ে নেয় নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী বর্ণ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি বেসরকারি বিদ্যালয় রেসিডেন্সিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের এই ছাত্রী জলরঙে এঁকেছে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের এক আবেগঘন দৃশ্য। তার তুলির টানে যেন ফুটে উঠেছে এক পরিণত শিল্পীর দক্ষতা, যা উপস্থিত সকলকেই মুগ্ধ করে।
শুধু বর্ণই নয়, এসএসসি পরীক্ষার্থী প্রাপ্তি সাহা, পঞ্চম শ্রেণীর মৃদুতা চৌধুরী, ষষ্ঠ শ্রেণীর সারা এবং অষ্টম শ্রেণীর ইমরা জান্নাত সুরাসহ আরও অনেক শিক্ষার্থী তাদের সৃষ্টিশীল কাজ দিয়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে।
এদিকে কর্মশালা ঘুরে দেখলে মনে হয় যেন ছোট্ট একটি জাদুঘর। একাডেমির দেয়ালজুড়ে আঁকা হয়েছে নানা ধরনের থ্রিডি চিত্র, যা মোবাইল ক্যামেরায় তাক করলেই জীবন্ত হয়ে ওঠে। কোথাও প্রাণী দৌড়াচ্ছে, কোথাও মনে হয় কেউ নাচছে কিংবা ঘাস খাচ্ছে—এমন ভ্রম সৃষ্টি করা এসব চিত্র প্রশিক্ষণার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবকদেরও মুগ্ধ করেছে। এই চিত্রকর্মগুলোর পেছনে রয়েছেন স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত প্রশিক্ষক মাহমুদুর রহমান রিয়েল, তারেক কোরাইশী এবং চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী সৌরভ।
প্রতিষ্ঠাতা মকবুল হোসেন সজীব জানান, তিনি কখনোই ব্যবসার উদ্দেশ্যে এই একাডেমি গড়ে তোলেন-নি। তার একমাত্র লক্ষ্য সৃজনশীল শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া। ২০০০ সাল থেকে চিত্রাঙ্কনের সঙ্গে যুক্ত এই শিল্পীর স্বপ্ন একদিন নিজের একটি আর্ট গ্যালারি প্রতিষ্ঠা করা। তবে আর্থিক সীমাবদ্ধতা সেই স্বপ্ন পূরণে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবুও থেমে নেই তার পথচলা। তিনি আশা করেন, উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা পেলে একদিন “ওয়ার্ল্ড আর্ট ভিলেজ” এর প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবেন।
কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন চপল। তিনি বলেন, এমন উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোগ থেমে যায়। আশা করি, সংশ্লিষ্টরা এগিয়ে আসবেন।
অভিভাবকরাও এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তাদের মতে, এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি শিশু-কিশোরদের জন্য একটি নিরাপদ ও সৃজনশীল পরিবেশ তৈরি করেছে, যা তাদের মোবাইল ফোনের আসক্তি থেকে দূরে রাখছে এবং সৃজনশীলতা বাড়াতে সহায়তা করছে।
কর্মশালার শেষভাগে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কেক কেটে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে বিতরণ করা হয়। ছোট্ট সেই গলিতে তখন আনন্দ, রঙ আর স্বপ্নের এক অপূর্ব মেলবন্ধনের দেখা মেলে।
Facebook Comments Box

Posted ৯:২৮ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬

dainiksarod |