নির্বাচনী বিরোধের জেরে দুই পক্ষের সংঘর্ষে তিনজন নিহত হওয়ার পর এখনও থমথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর। ঘটনার দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও স্বাভাবিক হয়নি গোয়ালনগরের ১০ গ্রামের জনজীবন।
সংঘর্ষের ঘটনায় গত ১ এপ্রিল নাসিরনগর থানায় পাল্টাপাল্টি মামলা করেছে বিবাদমান দুই পক্ষ। একটি মামলায় ১৭৭ জন এবং আরেকটি মামলায় ২৬৪ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং প্রতিটি মামলায় অজ্ঞাত ৫০০ থেকে ৭০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এরমধ্যে সংঘর্ষে জড়িতদের পাশাপাশি আসামি করা হয়েছে মৃত, শয্যাশায়ী, প্রবাসী, শিক্ষক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অনেককে।
এ ঘটনা হওয়া একটি মামলার বাদী মো. জহল মিয়া। তার স্বাক্ষরিত এজাহারের কপি অনুযায়ী, মামলায় ১১৭ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত ৬০০–৭০০ জনকে আসামি করে ৩০ মার্চ নাসিরনগর থানায় এজাহার জমা দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক চাপে ১ এপ্রিল এজাহার সংশোধন করে আরও ৫০ জনের নাম যুক্ত করে ১৭৭ জনকে আসামি করে আবার এজহার জমা দেওয়া হয়। সেখানে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্থানীয় এক সাংবাদিক ও তার বাবাকে আসামি করা হয়েছে।
সাংবাদিক আব্দুল্লাহ আল মাহমুদের অভিযোগ, গত বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি নাসিরনগর শহীদ মিনারে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে হামলার শিকার হয়ে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বশির উদ্দিন তুহিনকে প্রধান আসামি করে নাসিরনগর থানায় মামলা করেন তিনি। পরে আদালতে হাজির হয়ে সেই মামলায় জামিন পান বশির উদ্দিনসহ অন্যান্য আসামিরা। তদন্তে আসামিদের সম্পৃক্ততা রয়েছে উল্লেখ করে সম্প্রতি পুলিশের পক্ষ থেকে চার্জশিট দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী সাংবাদিকের অভিযোগ, এ বিষয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে গোয়ালনগরের সহিংসতায় দায়ের করা মামলায় ওই সংবাদকর্মী ও তার শিক্ষক বাবাকে আসামি করতে মামলার বাদী ও থানা পুলিশকে চাপ প্রয়োগ করেন নাসিরনগর উপজেলা বিএনপিন সাধারণ সম্পাদক বশির উদ্দিন।
এদিকে ঘটনার পর দায়ের হওয়া একাধিক মামলাকে ঘিরে ‘মামলা বাণিজ্যের’ অভিযোগও উঠেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রকৃত অপরাধীদের পাশাপাশি নিরীহ মানুষকেও আসামি করা হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
মামলার এক আসামি গোয়ালনগর ইউনিয়নের সিমেরকান্দি গ্রামের মুজিবর রহমানের ছেলে জাহাঙ্গীর আলম। যিনি ছয় মাস ধরে সৌদি আরবে অবস্থান করছেন। তাকে হত্যা মামলার ১০৭ নম্বর আসামি করা হয়েছে।
মামলায় ১১০ নম্বর আসামি করা হয়েছে জামাল মিয়া নামের এক ব্যক্তিকে। তিনি প্রায় ৩০ বছর আগেই মারা গেছেন। আর কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার শরীফপুর গ্রামের সত্তোরোর্ধ জারু মিয়াকে করা হয়েছে মামলার ১৭৬ নম্বর আসামি, তিনি ছয় মাস ধরে শয্যাশায়ী।
মৃত ব্যক্তিকে আসামি করার ব্যাপারে জামাল মিয়ার বড় ভাই কামাল মিয়া বলেন, আমার ভাই ৩০ বছর আগেই অসুস্থ হয়ে মারা গেছে। শুনলাম তাকেও নাকি হত্যা মামলার আসামি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জারু মিয়ার ভাতিজা মোবারক মিয়া বলেন, আমার চাচা একজন প্যারালাইজড ব্যক্তি। ছয় মাস ধরে তিনি শয্যাশায়ী। তাকে কীভাবে হত্যা মামলার আসামি করা হয়েছে, সেটি আমিও বুঝছি না।
প্রবাসী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ছয় মাস ধরে সৌদি আরবে থাকার পরও আমাকে মামলায় আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়াও অনেক নিরপরাধ ব্যক্তিকেও মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে বলে শুনছি। আমার আত্মীয়স্বজন অনেকের কাছে ভয় দেখিয়ে টাকা চাওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে ঐ মামলার বাদী মো. জহল মিয়ার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে কল দিলে তার মেয়ে সেটি রিসিভ করেন। তিনি বলেন, বাবা অনেকদিন ধরে বাড়িতে নেই। কাছে মোবাইলও নেই তার। তিনি মোবাইল ব্যবহার করতে পারেন না।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন সকালে গোয়ালনগর উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী এম এ হান্নানের সমর্থক ও রহিম গোষ্ঠীর সদস্য জিয়াউর রহমানকে আটক করে সেনাবাহিনী। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে ১০ দিনের কারাদণ্ড দেন। এ ঘটনায় স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য প্রার্থী অ্যাডভোকেট কামরুজ্জামান মামুনের সমর্থক এবং গোয়ালনগর ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি আবুল কাশেমের গোষ্ঠীর শিশু মিয়াকে সন্দেহ করতে থাকেন তিনি।
পরে কারাগার থেকে বের হয়ে জিয়াউর রহমান শিশু মিয়াকে মারধর করে তার মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নেন। এ ঘটনার পর থেকেই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে উত্তেজনা চলছিল। এরপর গত ১৭ মার্চ সকালে রহিম গোষ্ঠীর লোকজন কাশেম গোষ্ঠীর লোকজনের বাড়িঘরে হামলার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিকেলে উভয়পক্ষের লোকজন দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এ সময় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার একপর্যায়ে রহিম গোষ্ঠীর লোকজন পিছু হটতে বাধ্য হয়।
এরই জেরে কয়েকদিন প্রস্তুতি নিয়ে আশপাশের কয়েকটি গ্রাম থেকে লোকজন এনে ২৪ মার্চ সকালে ফের কাশেম গোষ্ঠীর লোকজনের বাড়িঘরে হামলা চালায় রহিম গোষ্ঠীর লোকজন। পরে কাশেম গোষ্ঠীর লোকজনের পক্ষেও আশপাশের কয়েকটি গ্রামের লোকজন এসে সংঘর্ষে যোগ দিলে উভয় পক্ষের মধ্যে কয়েক ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষ চলে।
একপর্যায়ে সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে টেঁটাবিদ্ধ হন গোয়ালনগর স্কুলপাড়া জামে মসজিদের ইমাম ও বড় গোষ্ঠীর সদস্য মাওলানা হাবিবুর রহমান (৪০)। পরে পার্শ্ববর্তী অষ্টগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
অপরদিকে, একই দিনে সংঘর্ষে আক্তার মিয়া নামেও একজন নিহত হন। এ ছাড়াও সংঘর্ষে উভয়পক্ষের শতাধিক লোক আহত হয়। পরবর্তীতে সংঘর্ষের পরদিন বুধবার (২৫ মার্চ) বিকেলে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মাফাজুল ইসলাম (৫০) নামে আরও একজন।
ভুক্তভোগী সংবাদকর্মী আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, গত বছর পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বশির ও তার অনুসারীদের হামলার শিকার হয়ে থানায় মামলা করেছিলাম। সম্প্রতি পুলিশ এই মামলার অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়েছে। আমি মামলাটি আপস করতে রাজি না হওয়ায় বশির উদ্দিন ক্ষুব্ধ হয়ে একটি পক্ষকে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে আমাকে ও আমার বাবাকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে মিথ্যা মামলায় জড়িয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে নাসিরনগর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বশির উদ্দিন বলেন, কাউকে আসামি করার বিষয়ে আমি কোনো চাপ প্রয়োগ করিনি, আমি কেন করতে যাব। মামলায় কাদেরকে আসামি করা হয়েছে এ বিষয়ে পুলিশ ভালো বলতে পারবে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি দীপক চৌধুরী বাপ্পি বলেন, একজন পেশাদার সাংবাদিককে প্রতিহিংসা বসত ষড়যন্ত্রমূলকভাবে মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে। এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। এই ষড়যন্ত্রের পেছনে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাই।
সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলার নিন্দা জানিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া টেলিভিশন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আল আমিন শাহিন বলেন, একজন পেশাদার সাংবাদিককে প্রতিহিংসা বসত মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাবের সভাপতি জাবেদ রহিম বিজন এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেন, সঠিকভাবে তদন্ত করে তাকে এই মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়ার দাবি করছি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার শাহ মোহাম্মদ আব্দুর রউফ বলেন, কেউ যেন অযথা হয়রানির শিকার না হয় এবিষয়ে নির্দেশনা দেয়া আছে। নিরপরাধ কেউ আসামি হয়ে থাকলে তদন্তসাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি খালেদ মাহবুব শ্যামল বলেন, মামলা দিয়ে হয়রানির বিষয়ে ভুক্তভোগীরা আমাদের কাছে অভিযোগ দিলে আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখব।