অনলাইন ডেস্ক
প্রিন্ট
বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : 8:57 pm
স্বল্প মজুরি এবং পশ্চিমা দেশগুলোর বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের সুবিধা কাজে লাগিয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হয়েছে বাংলাদেশ৷ তবে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকদের চলমান বিক্ষোভ দেশটির পোশাক শিল্পের ব্যয়-সুবিধাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে৷
গত শনিবার বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার আশপাশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে বিক্ষোভ শুরু হয়৷ বিক্ষোভের ফলে দেশের কয়েকশ পোশাক কারখানা উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়৷ শ্রমিকদের মূল দাবি- ১৪০ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধি৷ মজুরি বৃদ্ধিসহ পাঁচটি দাবি আদায়ের লক্ষ্যে বিক্ষোভ করার সময় পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ হয়েছে৷ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করেছে পুলিশ৷
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে ৪০ লাখ মানুষ কাজ করেন৷ এ অস্থিরতা এমন এক সময়ে দেখা দিলো, যখন এইচঅ্যান্ডএম, প্রাইমার্ক ও ওয়ালমার্টের মতো বড় ব্র্যান্ডগুলোর জন্য বসন্তকালীন পোশাক তৈরির প্রস্তুতি চলছিল৷ বৈশ্বিক পর্যায়ে তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর বিষয়টি বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে৷
বাংলাদেশের পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাহীরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ এবং ২০২৪ সালে দেশে সরকারবিরোধী ব্যাপক আন্দোলনের কারণে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিয়েছে৷ এ কারণে আগে থেকেই উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছিল৷ মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শুরু হওয়া এই অস্থিরতা পণ্য সরবরাহ নিয়ে ক্রেতাদের উদ্বিগ্ন করছে৷
জারা, গ্যাপ এবং মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সার-এর মতো ব্র্যান্ডকে পণ্য সরবরাহ করে স্প্যারো গ্রুপ৷ সোমবার এক বিশাল জনতা তাদের কারখানায় হামলা চালায়৷ এর ফলে বাধ্য হয়ে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়৷
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, একদল মানুষ ইট-পাথর ছুড়ছে, জানালা ভাঙচুর করছে এবং কারখানার বাইরের দেয়ালের ক্ষতি করছে৷ কারখানার প্রধান ফটক জোর করে খোলার চেষ্টা করতেও দেখা যায় তাদের৷ স্প্যারো গ্রুপের প্রধান শোভন ইসলাম জানান, পাঁচ হাজারেরও বেশি শ্রমিককে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে৷ হামলার সঙ্গে কারা জড়িত তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি৷
শোভন ইসলাম বলেন, ‘‘এই শিল্পের এটা সবচেয়ে ব্যস্ত মৌসুম৷” নভেম্বরে বড় ধরনের পণ্য চালান পাঠানোর কথা ছিল জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘‘এ পর্যায়ে যেকোনো ধরনের বিঘ্ন অত্যন্ত ক্ষতিকর৷ এটা (চলমান বিক্ষোভ) সবচেয়ে খারাপ সময়ে উৎপাদন ব্যাহত করছে৷ আমার সব ক্রেতাই এতে উদ্বিগ্ন৷”
বেতন বৃদ্ধিতে আন্তর্জাতিক বাজারে সুবিধা হারানোর শঙ্কা
এখনকার ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা (১০০ ডলার) থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা (২৪৩ ডলার) করার দাবিতে আন্দোলন করছেন পোশাকশ্রমিকরা৷ সর্বশেষ ২০২৩ সালে তাদের মজুরি বাড়ানো হয়েছিল৷ সেবার তাদের ন্যূনতম মজুরি ৫৬ শতাংশেরও বেশি বাড়ানো হয়৷ তার আগের দফাগুলোতে মজুরি ৫০ থেকে ৭৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল৷
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুর রহমান তরফদার জানান, মুদ্রাস্ফীতি, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং রপ্তানি পারফর্ম্যান্সের মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে মজুরি সংক্রান্ত সুপারিশ প্রদানের লক্ষ্যে রোববার একটি মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার৷
অ্যামেরিকান অ্যাপারেল অ্যান্ড ফুটওয়্যার অ্যাসোসিয়েশন মনে করে, এই মজুরি বোর্ড পোশাক শ্রমিকদের জন্য এমন ন্যায্য মজুরি নির্ধারণের সুযোগ তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে শ্রমিকরা নিজেদের ও পরিবারের ভরণপোষণ চালাতে পারবেন৷ তবে এখন থেকে প্রতি বছর মজুরি পর্যালোচনার একটি প্রক্রিয়া চালুর আহ্বানও জানিয়েছে তারা৷
অতীতে পোশাক শ্রমিকদের মজুরি যেভাবে বাড়ানো হয়েছে, এবার সেভাবে বাড়লে বাংলাদেশে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ভারতের চেয়ে বেশি হয়ে যেতে পারে৷ উল্লেখ্য, ভারত এই মুহূর্তে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম বস্ত্র রপ্তানিকারক দেশ৷
শিল্প সংশ্লিষ্টদের অনেকেই বলছেন, ভারতে পোশাক খাতে মাসিক ন্যূনতম মজুরি সাধারণত ১৩,০০০ রুপি (১৩৭ ডলার) থেকে ১৫,০০০ রুপির মধ্যে হয়ে থাকে৷ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-র ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, চীন ও ভিয়েতনামে শ্রমিকদের মজুরি বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ৷
বাংলাদেশের বন্দরনগরী চট্টগ্রামের পোশাক তৈরির প্রতিষ্ঠান ক্লফটন গ্রুপের প্রধান নির্বাহী এম. মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘‘ভারত (বাংলাদেশের জন্য) ক্রমশ শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে, কারণ, তাদের নিজস্ব তুলা উৎপাদন ব্যবস্থা ও শক্তিশালী সুতা শিল্প রয়েছে, পাশাপাশি এই শিল্পকে সহায়তা করার জন্য রয়েছে সরকারি প্রণোদনা৷”
এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ব্রিটেন ও ক্যানাডাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা ভোগ করলেও ভারত সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের সঙ্গে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করেছে৷ উল্লেখ্য, যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির দ্বিতীয় বৃহত্তম গন্তব্য৷ গত ৩০ জুন শেষ হওয়া গত অর্থবছরে পোশাক রপ্তানি খাতে বাংলাদেশের আয় আগের বছরের তুলনায় ১.৬৫ শতাংশ কমে ৩৮.৭০ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে৷ তবে জুলাই-সেপ্টেম্বরে তা ৬.১ শতাংশ বেড়ে ১০.৫৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে৷
‘সব দিকেই খরচ বাড়ছে’
ক্লফটন গ্রুপের প্রধান নির্বাহী এম. মহিউদ্দিন চৌধুরী জানান, সম্প্রতি ভারতীয়রা কম দামে পোশাক রপ্তানির প্রস্তাব দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের এক ক্রেতা নিটওয়্যার অর্ডারের ক্ষেত্রে প্রতি পিস পণ্যে ৩ সেন্ট দাম কমানোর দাবি জানিয়েছেন৷ তিনি বলেন, ‘‘এটা না মানার কোনো উপায় ছিল না,” অথচ গত এক বছরে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, শিপিং ও পণ্য পরিবহনের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পণ্য সরবরাহ সংক্রান্ত খরচ ৫ শতাংশ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে৷
এম. মহিউদ্দিন চৌধুরী আরো বলেন, ‘‘সব দিক থেকেই খরচ বাড়ছে, কিন্তু ক্রেতারা এখনও দাম কমানোর জন্য চাপ দিচ্ছেন৷”
‘‘যেখানে মুনাফার হার প্রায়ই মাত্র ২ শতাংশ থেকে ৩ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, সেখানে বাড়তি খরচ সামাল দেওয়ার মতো সুযোগ কারখানাগুলোর হাতে খুব কমই থাকে-” এমন মত প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘‘শ্রমিকদের দাবিগুলো যৌক্তিক হতে পারে, কিন্তু কর্মসংস্থান এবং কারখানার টিকে থাকার সক্ষমতার জন্য দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে৷”
জানা গেছে, বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে মোট খরচের প্রায় ১০ শতাংশ থেকে ১৩ শতাংশ যায় শ্রমিকদের মজুরিতে৷ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, ‘‘ক্রেতারা নির্ভরযোগ্যতাকে গুরুত্ব দেন৷” তিনি মনে করেন, ‘‘অর্ডার সময়মতো সরবরাহ করতে না পারলে, পণ্যের মানের ধারাবাহিকতা না থাকলে, কিংবা শ্রমিক অসন্তোষের কারণে বারবার উৎপাদন ব্যাহত হলে তুলনামূলকভাবে সস্তা সরবরাহকারীও শেষ পর্যন্ত অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে৷”
‘জানুয়ারি থেকে বাড়তি বেতন পাবেন শ্রমিকেরা’
তৈরি পোশাকশিল্পে আগামী ডিসেম্বর থেকে নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকর হবে, জানুয়ারি থেকে শ্রমিকেরা বাড়তি বেতন হাতে পাবেন – এমন আশ্বাস দেয়া হয়েছে৷
আজ বুধবার নিম্নতম মজুরি বোর্ডের প্রথম সভা শেষে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি এ বি এম শামসুদ্দিন ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি বাবুল আখতার এমন আশ্বাস দেন। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় নিম্নতম মজুরি বোর্ডের কার্যালয়ে আয়োজিত সভা শেষে মজুরি বোর্ডের নতুন চেয়ারম্যান সৈয়দ আজাদ সুবহানী সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘মজুরি বোর্ডের দ্বিতীয় সভায় শ্রমিক ও মালিকপক্ষ মজুরি–প্রস্তাব পৃথকভাবে জমা দেবে। একই সঙ্গে নিরপেক্ষ সদস্যও একটি মজুরি–প্রস্তাব দেবেন। তারপর সেই মজুরি–প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হবে।”
গত রোববার শ্রম মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নিম্নতম মজুরি বোর্ড পুনর্গঠন করা হয়। বোর্ডে নিরপেক্ষ সদস্য হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোসলেহ উদ্দিন আহমদ এবং মালিক ও শ্রমিকপক্ষের স্থায়ী সদস্য হিসেবে যথাক্রমে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুব ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে নিয়োগ করা হয়।
ওই দিনই আরেকটি প্রজ্ঞাপনে তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য গঠিত নিম্নতম মজুরি বোর্ডে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বিজিএমইএর পরিচালক এ বি এম সামছুদ্দিন ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের (বিজিআইডব্লিউএফ) সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতারকে নিয়োগ করা হয়।
গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন শেখ আশফাকুর রহমান। আজ সকালে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে তাকে বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের পরিচালক (প্রশিক্ষণ) পদে বদলি করা হয়। একই আদেশে নিম্নতম মজুরি বোর্ডের নতুন চেয়ারম্যান করা হয় জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ আজাদ সুবহানীকে।
সূত্র: ডয়চে ভেলে
Posted ৮:৫৭ পিএম | বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬
The Daily Sarod | Pijush Kanti Acharya