মোঃ আবদুল লতিফ
প্রিন্ট
রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : 10:04 pm
১৯৮৬ সাল। এক শীতের সকাল। আলিম পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হয়েছে। আমি প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছি। ফলাফল হাতে পাওয়ার পর মনে হলো—এই আনন্দের খবরটি সবার আগে যাঁর কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত, তিনি আমার প্রিয় উস্তাদজি সাইয়াউকের হযরত মাওলানা মহিউদ্দিন খন্দকার (ফাজিলে দেওবন্দ)। তিনি সাইয়াউকের ‘ছোট মাওলানা’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। আমরা তাঁকে ‘সুপারিনটেনডেন্ট হুজুর’ নামে ডাকতাম।
বাড়ি থেকে প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার পথ। কিন্তু প্রিয় শিক্ষকের দোয়া নেওয়ার আকাঙ্ক্ষার কাছে সেই পথ যেন কিছুই নয়। ছাতিয়াইন বাজার থেকে তাঁর জন্য সামান্য কিছু মিষ্টি কিনে নিলাম।
সকালের কোমল রোদ। উস্তাদজি একটি কাঠের চেয়ারে শুয়ে ছিলেন। চেয়ারটির মাঝখানের অংশটি ছিল মোটা কাপড়ের।
আমি কাছে গিয়ে সালাম দিলাম—
—আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
তিনি জবাব দিলেন—
—ওয়ালাইকুম আসসালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
তারপর দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলেন,
—কে?
বললাম,
—আমি আপনার ছাত্র, আবদুল লতিফ।
তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন,
—কোন আবদুল লতিফ?
আমি বললাম,
—কাঞ্চনপুরের আবদুল লতিফ।
তিনি কিছুক্ষণ থেমে বললেন,
—হাফেজ আবদুল লতিফ?
আমি বললাম,
—জি, হুজুর।
তিনি সঙ্গে সঙ্গে দুহাত বাড়িয়ে দিলেন। আমিও দুহাত বাড়িয়ে তাঁর সঙ্গে মুসাফাহা করলাম। তারপর তিনি আমার হাত ধরে আমাকে বুকের মধ্যে টেনে নিলেন।
কিছুক্ষণ আমরা দুজনেই নীরব।
সেই নীরবতার ভাষা আজও আমার হৃদয়ে বাজে।
আমি লক্ষ্য করলাম—উস্তাদজি চোখে দেখতে পাচ্ছেন না। কিন্তু তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। অশ্রুর ফোঁটা গড়িয়ে তাঁর দাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।
আমি কী বলব, বুঝতে পারছিলাম না।
একসময় বললাম,
—হুজুর, আমার আলিম পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হয়েছে। আমি প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছি।
আমার কথাটি শুনে তিনি কী পরিমাণ খুশি হয়েছিলেন—সেটা প্রকাশ করার মতো কোনো শব্দ আমার জানা নেই। সেই আনন্দ মাপার মতো কোনো যন্ত্রও পৃথিবীতে তৈরি হয়নি।
তিনি শুধু বললেন—
—মাশাআল্লাহ… আলহামদুলিল্লাহ।
কিন্তু আজও মনে হয়, সেই ‘মাশাআল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ’-এর ভেতরে যেন হাজারো দোয়া, হাজারো আনন্দ আর একজন শিক্ষকের বুকভরা ভালোবাসা লুকিয়ে ছিল।
তাঁর কণ্ঠ যেন আবেগে ভারী হয়ে এসেছিল।
তিনি আমার মাথায় হাত রাখলেন। পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করলেন।
সেদিন আমি প্রথমবার খুব গভীরভাবে উপলব্ধি করলাম—
একজন সত্যিকারের শিক্ষক শুধু ছাত্রকে পড়ান না; ছাত্রের সাফল্যকে তিনি নিজের সাফল্য মনে করেন। ছাত্রের আনন্দে তিনি আনন্দিত হন, আর কখনো কখনো সেই আনন্দের অশ্রু নিজের অজান্তেই চোখের কোণে জমে ওঠে।
আমি যে মিষ্টি নিয়ে গিয়েছিলাম, তা তাঁর হাতে তুলে দিলাম।
মিষ্টি হাতে নিয়েই তিনি বললেন,
—তুমি ছাত্র, টাকা পেলে কোথায়? তুমি তো ছাত্র!
আমি বললাম,
—আম্মা টাকা দিয়েছেন। আপনার জন্য কিছু নিয়ে আসতে বলেছেন।
কথাটি শুনে তিনি নিশ্চয়ই আমার মায়ের জন্যও অন্তর থেকে দোয়া করেছিলেন।
এরপর তিনি আমাকে তাঁর থাকার ঘরে নিয়ে গেলেন। সেখানে দেখলাম, কার্টনভর্তি বিভিন্ন ধরনের ফল। তাঁর ছেলে মিয়াজী পাঠিয়েছেন।
সেখান থেকে তিনি আমাকে কিছু ফল খেতে দিলেন।
তারপর হঠাৎ আমাকে নিয়ে বাড়ির ভেতরের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। একটি দরজার সামনে গিয়ে ডাকলেন—
—মিয়াজির মা! আমার সবচেয়ে প্রিয় ছাত্র হাফেজ আবদুল লতিফ এসেছে। আমাকে দেখতে এসেছে। তুমি তাড়াতাড়ি একটা মুরগি জবাই করো। ওর জন্য ভালো খাবারের ব্যবস্থা করো।
আমি নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
একজন শিক্ষক তাঁর ছাত্রকে কতটা ভালোবাসলে, বহুদিন পর বাড়িতে আসা একজন ছাত্রকে এভাবে আপন করে নিতে পারেন!
আজ এত বছর পরও সেই দৃশ্যটি চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
এই বাড়িতে আমার সেটা প্রথম আসা ছিল না।
আমি যখন ধর্মন্ডল কাজীবাড়ি হাফিজিয়া মাদ্রাসায় পড়তাম, তখন মাঝেমধ্যে শুক্রবারে এই বাড়িতে আসতাম। দুপুরে খাওয়া-দাওয়া করতাম। বাড়ির বয়স্ক মুরব্বি মহিলারা আমাকে কাছে বসিয়ে বলতেন, ‘কোরআন তেলাওয়াত করে শোনাও।’
আমি তেলাওয়াত করতাম।
তাঁরা মনোযোগ দিয়ে আমার কোরআন তেলাওয়াত শুনতেন এবং আমার জন্য দোয়া করতেন।
সেই বাড়ির প্রতিটি কোণ, প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি স্মৃতি আজও আমার হৃদয়ে জীবন্ত।
কিছু স্মৃতি মানুষ চাইলেও ভুলতে পারে না।
এই বাড়ির স্মৃতি কি আমি কোনোদিন ভুলতে পারি?
না, পারি না।
কিন্তু কে জানত, ১৯৮৬ সালের সেই শীতের সকালেই প্রিয় উস্তাদজির সঙ্গে আমার জীবনের শেষ দেখা হয়ে যাচ্ছে!
আমি তাঁকে সালাম করে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে এলাম।
তখনও জানতাম না—এটাই শেষ দেখা।
জানতাম না—আর কোনোদিন তাঁর সামনে বসে ‘হুজুর’ বলে ডাকতে পারব না।
জানতাম না—আর কোনোদিন তাঁর হাত আমার মাথায় উঠবে না।
জানতাম না—আর কোনোদিন তাঁর কণ্ঠে শুনতে পাব না সেই স্নেহভরা ‘মাশাআল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ’।
মানুষ আসলে বিদায়ের মুহূর্তে কখনো জানে না—কোন বিদায়টি শেষ বিদায়।
আজ এত বছর পর সেই শীতের সকালটির কথা মনে পড়লে বুকের ভেতরটা কেমন যেন হাহাকার করে ওঠে।
মনে হয়, যদি সেদিন জানতাম সেটিই হবে শেষ দেখা, তাহলে হয়তো আরও কিছুক্ষণ তাঁর হাত ধরে বসে থাকতাম।
আরও কিছু কথা বলতাম।
আরও একবার তাঁর কণ্ঠ শুনতাম।
আরও একবার তাঁর বুকের মধ্যে মাথা রাখতাম।
কিন্তু জীবন কাউকে দ্বিতীয়বার সেই সুযোগ দেয় না।
লেখা দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে। তাই আজ আর সব স্মৃতি লিখলাম না।
আল্লাহ যদি জীবন দেন, কোনো এক শিক্ষক দিবসে আমার সেই প্রিয় উস্তাদজিকে নিয়ে আরও কিছু স্মৃতি সম্মানিত পাঠকদের সামনে তুলে ধরব—এই প্রত্যাশা রইল।
আজ শুধু এটুকুই বলি—
একজন ভালো শিক্ষক হয়তো একদিন আমাদের শ্রেণিকক্ষ থেকে বিদায় নেন, কিন্তু তাঁর হাতের স্পর্শ, তাঁর কণ্ঠের দোয়া, তাঁর চোখের অশ্রু এবং তাঁর ভালোবাসা কখনো আমাদের জীবন থেকে বিদায় নেয় না।
আমার সেই প্রিয় উস্তাদজি আজ দুনিয়াতে নেই। কিন্তু তাঁর ভালোবাসা, তাঁর শিক্ষা এবং তাঁর দোয়ার স্মৃতি আজও আমার হৃদয়ে বেঁচে আছে।
আল্লাহ আমার প্রিয় উস্তাদজি হযরত মাওলানা মহিউদ্দিন খন্দকার (ফাজিলে দেওবন্দ)-কে জান্নাতুল ফেরদাউসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন।
আর পৃথিবীর সকল শিক্ষককে আল্লাহ সুস্থতা, শান্তি ও সম্মানের সঙ্গে রাখুন। যাঁরা দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন, তাঁদের সবাইকে ক্ষমা করে জান্নাত নসিব করুন।
আমিন। আল্লাহ হাফেজ।
মোঃ আবদুল লতিফ
শিক্ষক ও লেখক
প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত)
গভ. মডেল গার্লস হাই স্কুল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
Posted ১০:০৪ পিএম | রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬
The Daily Sarod | Pijush Kanti Acharya