নাসিরনগর উপজেলা প্রতিনিধি
প্রিন্ট
বুধবার, ০৯ জুলাই ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট : 1:01 pm
আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল নেতা সোহরাব মিয়া হত্যাকাণ্ডের পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের চাতলপাড় ইউনিয়ন এক ভুতুড়ে জনপদে পরিণত হয়েছে। প্রতিশোধের আগুনে পুড়ছে বাড়িঘর, চলছে অবাধ লুটপাট। গ্রেপ্তার এড়াতে এবং পাল্টা হামলার ভয়ে পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে পুরো এলাকা। নারী ও শিশুদের নিয়ে গ্রাম ছেড়েছে শতাধিক পরিবার। কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন, কারও ঠাঁই হয়েছে খোলা আকাশের নিচে। গ্রামজুড়ে এখন কেবলই নারী ও শিশুদের হাহাকার আর পোড়া বাড়ির ধ্বংসস্তূপ।
গত শনিবার (৫ জুলাই) মোল্লা গোষ্ঠী ও উল্টা গোষ্ঠীর মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে নিহত হন চাতলপাড় ইউনিয়ন ছাত্রদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক সোহরাব মিয়া (২৬)। এ ঘটনার পর থেকেই পুরো ইউনিয়নে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিপক্ষের বাড়িঘরে শুরু হয় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের পথে পথে ছড়িয়ে আছে ভাঙা কাচ, পোড়া টিন আর লণ্ডভণ্ড আসবাবপত্র। কয়েকটি বাড়িতে তখনও ধোঁয়া উড়ছে।
অসহায় সাফিয়া বেগম অভিযোগ করে বলেন, “আমার স্বামী দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ হয়ে বিছানায়। কিন্তু মোল্লা গোষ্ঠীর লোকজন আমার ঘরটা পুড়িয়ে দিল। আমার একটা ছেলে সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে এই ঘরটা তুলেছিল। আজকে আমার সব শেষ।”
অন্তঃসত্ত্বা কুহিনূর বেগম বলেন, “আমি অসুস্থ। আমায় অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে গলা থেকে স্বর্ণালংকার লুট করে ঘরে থাকা সবকিছু নিয়ে গেছে। এমনকি আমার ওষুধগুলোও নিয়ে গেছে। বারবার অনুরোধ করার পরও আমার হাত-পা বেঁধে রেখে চলে যায়।”
সখিনা বেগম নামে আরেক বৃদ্ধার কথায় ছিল কেবলই অসহায়ত্ব আর ভয়। তিনি বলেন, “সবকিছু চোখের সামনে পুড়তে দেখলাম। বাধা দেওয়ার মতো কেউ ছিল না। ছেলেরা ভয়ে পালিয়েছে। আমরা কই যাব, কী খাব, কিছুই জানি না।”
সংঘর্ষ ও প্রাণহানির প্রভাব পড়েছে এলাকার শিক্ষাব্যবস্থায়। কাঠালকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৩০০ জনের বেশিই অনুপস্থিত। প্রাণভয়ে ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির ২১ শিক্ষার্থী প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। কেবল শিক্ষার্থী নয়, আতঙ্কে একজন শিক্ষকও ছুটি নিয়ে আত্মগোপনে আছেন। প্রধান শিক্ষক তুহিনা বেগম বলেন, “শিক্ষার্থীরা তো বটেই, শিক্ষকরাও আতঙ্কে আছেন। অভিভাবকদের ফোন করেও সাড়া পাচ্ছি না।”
শুধু ঘরবাড়িই নয়, হামলাকারীদের তাণ্ডব থেকে রক্ষা পায়নি চাতলপাড় বাজারের ছয়টি দোকানও। এর মধ্যে চালের আড়ত, মোবাইল ও বিকাশের দোকান এবং রড-সিমেন্টের দোকান রয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, দোকানগুলো থেকে প্রায় ২০ কোটি টাকার মালামাল লুট হয়েছে। হামলাকারীরা ১০টি গরু ও কৃষকের গোলা থেকে প্রায় এক হাজার মণ ধানও নিয়ে গেছে।
ব্যবসায়ী হামজা ভেঙে পড়া কণ্ঠে বলেন, “আমার ২৫ লাখ টাকা ও দোকানের সবকিছু লুট করে নিয়ে গেছে। পথে বসা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।”
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চাতলপাড় ইউনিয়নের কাঁঠালকান্দির মোল্লা গোষ্ঠী ও উল্টা গোষ্ঠী মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই এই সংঘর্ষের সূত্রপাত। হত্যাকাণ্ডের চারদিন পর নিহতের ভাই মোজাহিদ মিয়া বাদী হয়ে নাসিরনগর থানায় মামলা করেছেন। মামলায় ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি মো. গিয়াস উদ্দিন, বিএনপির সহ-সভাপতি মো. আফসর মিয়া, ইউনিয়ন ছাত্রদলের সহ-সভাপতি শরীফ মিয়া সহ ৬০ জনকে আসামি করা হয়।
মোল্লা গোষ্ঠীর গিয়াস উদ্দিন অভিযোগ করেন, তাদের গোষ্ঠীর অন্তত পাঁচজনের বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং ৪০টির বেশি বাড়িতে লুটপাট চালানো হয়েছে। হামলা থেকে রক্ষা পায়নি স্থানীয় বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল ও জাসাসের নেতাদের বাড়িঘরও।
এদিকে, নিহতের ভাই মোজাহিদ মিয়া ভাইয়ের হত্যার বিচার চেয়েছেন এবং প্রতিপক্ষের বাড়িতে লুটপাটে নিজেদের জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
চাতলপাড় ফাঁড়ি পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, “আমাদের জনবল কম এবং যাতায়াতের সুবিধা নেই। তাই ওই এলাকায় যাওয়া কঠিন। লুটপাটের সময় নিহতের স্বজনরা টেঁটা-বল্লম নিয়ে পাহারা দেওয়ায় আমাদেরও নিরাপত্তা নেই, তবুও আমরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।
Posted ১:০১ পিএম | বুধবার, ০৯ জুলাই ২০২৫
The Daily Sarod | Pijush Kanti Acharya