বাংলাদেশের বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপন জারি করে বলেছে, “পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের স্বার্থে এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার পূরণে সরকারি, বেসরকারি সংস্থা ও ব্যক্তি পর্যায়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচীতে আগ্রাসী প্রজাতির ইউক্যালিপটাস এবং আকাশমনি গাছের চারা রোপণ, উত্তোলন ও বিক্রয় নিষিদ্ধ করা হলো। উক্ত আগ্রাসী প্রজাতির গাছের চারা রোপণের পরিবর্তে দেশিয় প্রজাতির ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ করে বনায়ন করতে হবে।”
আগ্রাসী প্রজাতির ইউক্যালিপটাস গাছের চারা রোপণ, উত্তোলন ও বিক্রয় নিষিদ্ধ করায়, আজ আমরা বিস্তারিত জানার চেষ্টা করবো ইউক্যালিপটাস গাছ নিয়ে। ইউক্যালিপ্টাস একটি বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত বিদেশি প্রজাতির উদ্ভিদ, এর প্রভাব বিশ্বব্যাপী পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যে দৃশ্যমান। মূলত অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় উদ্ভিদ হলেও বর্তমানে বিশ্বের বহু দেশে বিশেষ করে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ও উপগ্রীষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে এর বিস্তার ঘটেছে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। স্বাধীনতার পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দ্রুতবর্ধনশীল বৃক্ষ হিসেবে ইউক্যালিপ্টাস গাছ রোপণের প্রবণতা শুরু হয়। একদিকে যেমন কাঠের চাহিদা পূরণে এর অবদান রয়েছে, অন্যদিকে পরিবেশের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে।
ইউক্যালিপ্টাস গাছের বৈজ্ঞানিক নাম Eucalyptus obliqua। এ গাছটির প্রায় ৮০০টিরও বেশি প্রজাতি রয়েছে এবং এটি সাধারণত অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ফিলিপাইন, নিউগিনি, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি অঞ্চলে বেশি জন্মে। গাছটি উচ্চতায় ১০-১২ তলা বিল্ডিংয়ের সমান হতে পারে। এর ডালপালা খুব কম এবং পাতাগুলো সরু হওয়ায় ছায়া দান করতে পারে না। ফলে অন্যান্য গাছের মতো পরিবেশে শীতলতা বা ছায়া সৃষ্টি করে না। ইউক্যালিপ্টাস গাছ, অস্ট্রেলিয়ার প্রাকৃতিক এক আশ্চর্য, যা প্রাথমিকভাবে ঔষধি গুণ ও কাঠের ব্যবহারিক সুবিধার জন্য প্রশংসিত হলেও সময়ের সাথে সাথে তা এক ভয়ঙ্কর পরিবেশগত হুমকিতে রূপ নিয়েছে। এই গাছ মূলত দ্রুত বৃদ্ধির জন্য পরিচিত। অধিকাংশ ইউক্যালিপ্টাস গাছ এক বছরে দুই-তিন মিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে। কাঠের চাহিদা মেটাতে এবং বনায়ন ত্বরান্বিত করতে ইউক্যালিপ্টাস একটি আদর্শ সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, এর আশঙ্কাজনক পরিবেশগত প্রতিক্রিয়াগুলো প্রথম দিকে কেউ গুরুত্ব দেয়নি।বাংলাদেশে ইউক্যালিপ্টাস গাছের আগমন ঘটে ১৯৫০-এর দশকে, তবে বাণিজ্যিকভাবে এর চাষ শুরু হয় ১৯৮০-এর দশকে। বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সহায়তায় সামাজিক বনায়ন প্রকল্পের আওতায় এই গাছ বিভিন্ন জেলায় রোপণ করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল সরকারি খাসজমি, রেললাইন, সড়কপথ এবং পতিত জমিতে দ্রুতবর্ধনশীল গাছ লাগিয়ে কাঠের ঘাটতি পূরণ ও বন আচ্ছাদন বৃদ্ধি করা। বাংলাদেশে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, দিনাজপুর, রাজশাহী ও সিলেট অঞ্চলে ইউক্যালিপ্টাস ব্যাপক হারে রোপণ করা হয়। বেসরকারি পর্যায়েও কৃষক ও ব্যবসায়ীরা দ্রুত লাভজনক গাছ হিসেবে এটি চাষ শুরু করেন। কিন্তু কয়েক দশক পরে দেখা গেল এই গাছ দেশের পরিবেশ ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির জন্য এক গভীর হুমকি হয়ে উঠেছে।
অনেকেই মনে করতে পারে যে, গাছ মানেই তো পরিবেশ রক্ষা, কার্বন শোষণ এবং অক্সিজেন সরবরাহ। কিন্তু ইউক্যালিপ্টাস গাছের ক্ষেত্রে এটি কতটা সত্য, এটা জানা জরুরী। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ইউক্যালিপ্টাস গাছের শিকড় অত্যন্ত শক্তিশালী এবং গভীরে প্রবেশ করে আশপাশের মাটির পানি ও পুষ্টি উপাদান সম্পূর্ণরূপে শোষণ করে নেয়। ফলে আশেপাশের কোনো গাছ বা ফসল বেড়ে উঠতে পারে না। শুধু তাই নয়, শিকড় থেকে নির্গত হয় কিছু রাসায়নিক, যেগুলো আশপাশের উদ্ভিদের বৃদ্ধি ব্যাহত করে। একে বলে Allelopathy। এটি মাটির আর্দ্রতা দ্রুত হ্রাস করে ও পানির স্তর নিচে নামিয়ে ফেলে। যেখানে ইউক্যালিপ্টাস বেশি, সেখানে জলাধার শুকিয়ে যেতে দেখা যায়। ফসলি জমিতে ইউক্যালিপ্টাস গাছ লাগানোর ফলে সেসব জমির উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়। কৃষকেরা অনেক সময় গাছটি কাটতে চান না, কারণ কাঠের কিছু আর্থিক মূল্য রয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এর ক্ষতি লাভের চেয়ে বেশি। অনেক অঞ্চলে দেখা গেছে ইউক্যালিপ্টাস গাছ লাগানোর ফলে ধান, সবজি বা অন্যান্য ফসল ফলানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এছাড়া, ইউক্যালিপ্টাস গাছের ফুল ও ফল থেকে নির্গত কিছু অণু-উপাদান বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে যা মানবদেহের শ্বাসনালীতে প্রবেশ করে। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ এবং শ্বাসকষ্ট রোগীদের জন্য তা গুরুতর ক্ষতির কারণ হতে পারে। গবেষণায় এমনকি হৃদরোগ পর্যন্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে। গাছটি পুকুর বা জলাশয়ের আশেপাশে থাকলে মাছের মৃত্যুও ঘটতে দেখা গেছে। এছাড়া গাছটি ঘন বন তৈরি করে না, কারণ এতে পাতার পরিমাণ কম এবং ছায়া সৃষ্টি হয় না। ফলে বনের স্বাভাবিক বাস্তুসংস্থান ধ্বংস হয়। এতে করে পাখি, কীটপতঙ্গ, ছোট প্রাণী ইত্যাদির আবাসস্থল ধ্বংস হয় এবং জীববৈচিত্র্য কমে যায়।কিছু বিশ্লেষকের মতে, ইউক্যালিপ্টাস গাছের কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। এটি দ্রুত বেড়ে ওঠে এবং এর কাঠের মান ভালো হওয়ায় বানিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত হয়, বিশেষ করে কাগজশিল্পে। কিছু কিছু অঞ্চলে এর তেল থেকে ওষুধ তৈরি হয় এবং এটি মশা তাড়ানোর কাজেও ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এই সীমিত উপকারিতা পরিবেশগত, কৃষিজ এবং স্বাস্থ্যগত ক্ষতির তুলনায় অতি নগণ্য। সেজন্য পরিবেশবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই ইউক্যালিপ্টাস গাছের পরিবর্তে দেশি প্রজাতির, পরিবেশবান্ধব বৃক্ষ রোপণের পরামর্শ দিয়ে আসছেন।
সামগ্রিকভাবে, পরিবেশের উপর ইউক্যালিপ্টাস গাছের ক্ষতিকর প্রভাব সমূহ হলো-
১. ভূগর্ভস্থ পানি নিঃশেষীকরণ: ইউক্যালিপ্টাস গাছের শিকড় খুব গভীরে গিয়ে পানি শোষণ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, একটি পূর্ণবয়স্ক ইউক্যালিপ্টাস গাছ দিনে গড়ে ৯০ থেকে ২০০ লিটার পানি গ্রহণ করতে পারে। এর ফলে মাটির নিচের পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যায়। বিশেষত খরা প্রবণ ও পানির অভাবে ভোগা এলাকাগুলোতে ইউক্যালিপ্টাস চাষ কৃষিকাজে বিরূপ প্রভাব ফেলে।
২. জমির উর্বরতা হ্রাস: ইউক্যালিপ্টাস গাছের পাতা ও বাকলে থাকে allelopathic রাসায়নিক, যা মাটিতে পড়ে অন্যান্য উদ্ভিদের বীজ অঙ্কুরোদগমে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে গাছের নিচে অন্যান্য উদ্ভিদ জন্মায় না এবং দীর্ঘদিন পরে জমিটি অনুর্বর হয়ে পড়ে। একে বলা যায় “জৈব মরুভূমি”।
৩. জীববৈচিত্র্যের ধ্বংস: এই গাছের নিচে ঘন ছায়া তৈরি হয় এবং পাতার রাসায়নিক গুণের কারণে অন্যান্য গাছপালা টিকে থাকতে পারে না। এর ফলে একপ্রকার একক প্রজাতির বন (monoculture forest) তৈরি হয়, যেখানে পাখি, কীটপতঙ্গ, স্তন্যপায়ী প্রাণী ও অন্যান্য জীবের আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে যায়। দীর্ঘমেয়াদে এটি স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংস করে ফেলে।
৪. অগ্নিঝুঁকি বৃদ্ধি: ইউক্যালিপ্টাসের পাতা ও বাকল অত্যন্ত দাহ্য। এতে থাকা তেল (eucalyptol) সহজেই আগুন ধরে ফেলে এবং দাহ্যতা এত বেশি যে একবার আগুন লাগলে তা দ্রুত বিস্তার লাভ করে। ফলে বনাঞ্চলে আগুন লাগলে এটি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়ে।
৫. অর্থনৈতিক ক্ষতি ও কৃষির উপর প্রভাব: যেসব জমিতে ইউক্যালিপ্টাস রোপণ করা হয়েছে, সেখানে আশেপাশের কৃষিজমিতে জলাধানের অভাব দেখা দিয়েছে। পাট, ধান, সবজি ইত্যাদি ফসলের উৎপাদন কমেছে। অনেক কৃষক মনে করেন, ইউক্যালিপ্টাসের কারণে তাদের কৃষি জমির উর্বরতা হ্রাস পেয়েছে।
উল্লেখ্য বাংলাদেশের ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা অঞ্চলে ইউক্যালিপ্টাসের কারণে পাটক্ষেত ও ধানক্ষেত শুকিয়ে গেছে। অনেক কৃষক জমি ফেলে রাখতে বাধ্য হয়েছেন। চট্টগ্রাম অঞ্চলে পাহাড়ি এলাকায় ইউক্যালিপ্টাস রোপণ করা হলে দেখা গেছে, পাহাড়ে পানির ঝরনা শুকিয়ে গেছে এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্য লুপ্ত হয়েছে। সিলেট বিভাগের কিছু জেলায় এই গাছের নিচে কোনো ঘাস বা গুল্ম জন্ম নিচ্ছে না, ফলে গবাদি পশুর খাদ্যের সংকট তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন অধিদপ্তর ও পরিবেশবাদীরা ইউক্যালিপ্টাস রোপণের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে। আজ বন, পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক মন্ত্রণালয় ইউক্যালিপ্টাস উৎপাদন ও চাষে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।। তবে এখনও গ্রামীণ জনগণের মধ্যে সচেতনতার অভাব এবং কাঠের তাৎক্ষণিক লাভজনকতা ইউক্যালিপ্টাস চাষকে চালু রেখেছে। ইউক্যালিপ্টাসের বিকল্প হিসেবে নিম্নোক্ত কাজগুলো করা যায়-
১. দেশীয় গাছের ব্যবহার বৃদ্ধি: যেমন গামারি, শিরিষ, কাঠবাদাম, হিজল, করচ, হরতকি ইত্যাদি বৃক্ষ জলধারণে সহায়ক এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কার্যকর।
২. সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম: স্কুল, কলেজ এবং কৃষক সমাবেশে ইউক্যালিপ্টাসের ক্ষতি নিয়ে প্রচারণা চালানো উচিত।
৩. বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও তদারকি: প্রতি জেলায় গাছপালার প্রভাব নিয়ে জরিপ চালিয়ে কোন অঞ্চলে ইউক্যালিপ্টাস ক্ষতিকর তা চিহ্নিত করতে হবে।
৪. নীতিগত ব্যবস্থা: ইউক্যালিপ্টাস চাষে সরকার নিরুৎসাহিত করতে পারে যেমন: কর বৃদ্ধি, অনুদান বন্ধ, বিকল্প গাছ রোপণে ভর্তুকি প্রদান।
ইউক্যালিপ্টাস গাছ একটি নিঃশব্দ পরিবেশদ্রোহী বৃক্ষ, যা দীর্ঘমেয়াদে মানুষের কৃষি, স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একে যদি এখনই নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য

তা ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে। ইউক্যালিপ্টাস গাছ একদিকে যেমন দ্রুত কাঠ উৎপাদনের সমাধান, অন্যদিকে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য এক নিঃশব্দ শত্রু। বাংলাদেশে এর আগমন বনায়নের উত্তরণ হিসেবে দেখা হলেও সময়ের সাথে এটি এক বিরাট পরিবেশগত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখনই যদি সবাই সচেতন না হয়, তবে ভবিষ্যতে এই গাছ আমাদের জল, মাটি ও জীবনের ভারসাম্য ধ্বংস করে দেবে। প্রকৃতিকে বাঁচাতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে স্থানীয় গাছপালার প্রতি, যেখানে থাকবে ভারসাম্য, প্রাণ, এবং পরিবেশের প্রকৃত সুরক্ষা।