আশিকুর রহমান চৌধুরী পনি
প্রিন্ট
রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : 10:54 pm
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে গেলো কয়েক সপ্তাহে একের পর এক প্রাণহানির ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক বাড়ছে। কখনো অজ্ঞাত অবস্থায় মরদেহ উদ্ধার, কখনো তুচ্ছ বিরোধের জেরে প্রাণহানি।আবার কখনো নদীপথে স্পিডবোট ও বাল্কহেডের সংঘর্ষে একসঙ্গে দুজনের মৃত্যু—পরপর এসব ঘটনায় উপজেলার সার্বিক জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।
আগস্টের শেষ থেকে সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন ও স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে অন্তত ১০ জনের মৃত্যুর ঘটনা সামনে এসেছে। তবে এসব ঘটনাকে একই ধরনের অপরাধ বা একই কারণের সঙ্গে যুক্ত করার মতো প্রমাণ এখনো নেই। ঘটনাগুলোর প্রকৃতি ভিন্ন ভিন্ন।কিছু হত্যার অভিযোগ, কিছু বিরোধজনিত সহিংসতা, একটি নৌ দুর্ঘটনা এবং কয়েকটি রয়েছে অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা।
স্কচটেপে মোড়ানো মরদেহ ঘিরে নতুন আতঙ্ক:
২১ সেপ্টেম্বর নাসিরনগর উপজেলা সদরের সরকারি কলেজ মোড়সংলগ্ন এলাকায় হাত ও মুখে স্কচটেপ মোড়ানো অবস্থায় আরজান মিয়া নামে এক অটোরিকশাচালকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়ে। পরে পাশ্ববর্তী উপজেলা লাখাই থেকে তার স্বজনরা লাশ শনাক্ত করেন। জানা গেছে, বাড়ি থেকে অটোরিকশা নিয়ে বের হওয়ার পর তিনি নিখোঁজ ছিলেন। পরে তাঁর অটোরিকশাটিও বুড়িশ্বর ইউনিয়নের বেনিপাড়া এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। ঘটনাটি নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অটোরিকশাটি কোথায় এবং কীভাবে সেখানে গেল, আরজানকে কারা নিয়ে গিয়েছিল, তাঁর সঙ্গে সর্বশেষ কারা যোগাযোগ করেছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন নির্ভর করছে সুষ্ঠু তদন্তের ওপর। অবশ্য তার পরিবারের পক্ষ থেকে অটোরিকশা ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে হত্যার অভিযোগ করা হয়েছে।
লুডু খেলাকে কেন্দ্র করে প্রাণ গেল যুবকের:
১০ সেপ্টেম্বর গুনিয়াউক ইউনিয়নের নিশ্চিন্তপুর গ্রামে মুঠোফোনে লুডু খেলা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক ও হাতাহাতির ঘটনায় রফিক মিয়া নামে এক যুবক নিহত হন। লুডু খেলার সময় ‘ভুল ধরিয়ে দেওয়া’কে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত হয় এবং পরে মারধরের ঘটনা ঘটে। পরে প্রতিপক্ষের বাড়িতে ব্যাপক ভাংচুর ও লুটপাট হয়।
একটি সাধারণ তর্ক কীভাবে প্রাণঘাতী সহিংসতায় পরিণত হলো—এ ঘটনায় ও স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ নিয়ন্ত্রণ ও তাৎক্ষণিক আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জমি নিয়ে সংঘর্ষে নিহত নাজিম উল্লাহ:
৪ সেপ্টেম্বর উপজেলার বুড়িশ্বর গ্রামে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে দুই পক্ষের সংঘর্ষে নাজিম উল্লাহ (২২) নামে এক যুবক নিহত হন। ঘটনায় আরও কয়েকজন গুরুতর আহত হয়। পাশাপাশি হত্যাকান্ডের জেরে প্রতিপক্ষের বাড়িতে ব্যাপক ভাংচুর করে লুটপাট করা হয়। স্থানীয় বিরোধ, জমি-পুকুরের মালিকানা এবং আধিপত্যের দ্বন্দ্ব—এসব বিষয় নাসিরনগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর কতটা প্রভাব ফেলছে, সেটিও অনুসন্ধানের দাবি রাখে।
অজ্ঞাত মরদেহ নিয়ে প্রশ্ন:
২৭ আগস্ট গোকর্ণ ইউনিয়নের জেঠাগ্রাম চটিপাড়া এলাকার একটি পরিত্যক্ত ডোবা থেকে অজ্ঞাত এক তরুণের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ । পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের সূত্র ধরে তাঁর পরিচয় হাবিবুর রহমান (১৮) হিসেবে শনাক্ত হয়। মরদেহটি পানিতে দীর্ঘ সময় থাকায় ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।অজ্ঞাত অবস্থায় মরদেহ উদ্ধার এবং পরে পরিচয় শনাক্তের এমন ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে—নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্য সংরক্ষণ ও দ্রুত শনাক্তে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয় কতটা কার্যকর?
এরপর ৭ সেপ্টেম্বর হরিপুর এলাকায় আরও এক অজ্ঞাত ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে স্বজনরা মরদেহটি চাপরতলা ইউনিয়নের কালিউতা গ্রামের হাবিবুর রহমান (৩৮) বলে শনাক্ত করেন। তাঁর নিখোঁজ হওয়ার আগে মুক্তিপণের ফোন পাওয়ার অভিযোগও পরিবারের পক্ষ থেকে করা হয়েছে; এ ঘটনায় হত্যা মামলাও হয়েছে।
ফান্দাউকে অজ্ঞাত মরদেহ:
৪ সেপ্টেম্বর ফান্দাউক এলাকায় আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে শ্মশানসংলগ্ন ঝোপ থেকে অজ্ঞাত এক ব্যক্তির অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধারের তথ্য স্থানীয়ভাবে পাওয়া গেছে। মৃত ব্যক্তির বয়স আনুমানিক ৩৭ বছর বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল।
এই ঘটনার ক্ষেত্রে পরিচয় শনাক্ত, মৃত্যুর কারণ এবং মরদেহটি অন্য কোন জায়গা থেকে এনে সেখানে ফেলা হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি আজও।
নদীপথেও নিরাপত্তার সংকট:
১৪ সেপ্টেম্বর রাতে নাসিরনগরের বেমালিয়া নদীতে স্পিডবোট ও স্টিলের বাল্কহেডের মুখোমুখি সংঘর্ষে দয়াল মিয়া ও সজীব মিয়া নিহত হন। এ ঘটনায় আরও একজন আহত হন। অসুস্থ রোগীকে নাসিরনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৌঁছে দিয়ে ফেরার সময় স্পিডবোটটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে।
এ ঘটনার পর রাতের নদীপথে নৌযান চলাচলের নিরাপত্তা, আলো ও দৃশ্যমানতা, বাল্কহেডের চলাচল এবং নৌযান পরিচালনার নিয়ম মানা হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ও সামনে এসেছে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রতিটি মৃত্যুর ঘটনা আলাদাভাবে দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। বিশেষ করে অজ্ঞাত মরদেহের পরিচয় শনাক্ত, হত্যার অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন, বিরোধপ্রবণ এলাকায় নজরদারি এবং নদীপথে নিরাপত্তা জোরদারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
স্ত্রীকে শ্বাসরোধে হত্যার অভিযোগ স্বামী পলাতক:
২৪ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার ভোর রাতে নাসিরনগর সদর ইউনিয়নের কুলিকুন্ডা গ্রামের হিন্দুপাড়া এলাকায় উষা দেবনাথ (৩০) নামে এক গৃহবধূকে শ্বাসরোধে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তার স্বামীর বিরুদ্ধে। ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত স্বামী নারায়ণ দেবনাথ পলাতক রয়েছেন।
নিখোঁজের ২ দিন পর মাদ্রাসা সুপারের লাশ উদ্ধার:
সর্বশেষ শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় নিখোঁজের দুই দিন পর নাসিরনগর উপজেলার গুনিয়াউক ইউনিয়নের দক্ষিণ বেলমুড়া এলাকা থেকে ফরিদুল রহমান (৩৬) নামে এক মাদ্রাসা সুপারের অর্ধগলিত মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। নিহত ফরিদুল রহমান হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার রায়পুর গ্রামের ছাবির হোসেনের ছেলে। তিনি হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার মোহাম্মদপুর বাগে মদিনা ইবতেদায়ি মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
স্থানীয়দের দাবি, প্রতিটি মৃত্যুর ঘটনা আলাদাভাবে দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। বিশেষ করে অজ্ঞাত মরদেহের পরিচয় শনাক্ত, হত্যার অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন, বিরোধপ্রবণ এলাকায় নজরদারি এবং নদীপথে নিরাপত্তা জোরদারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
সার্বিক বিষয়ে নাসিরনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীনুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘যেসব হত্যাকাণ্ডের (মার্ডার) ঘটনা নিয়ে কথা বলা হয়েছে, সেগুলো সত্য। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং তদন্ত চলমান রয়েছে। ঘটনাগুলোর তদন্তে ডিবি, র্যাবসহ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট কাজ করছে।
Posted ১০:৫১ পিএম | রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
The Daily Sarod | Pijush Kanti Acharya