অনলাইন ডেস্ক
প্রিন্ট
মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : 11:02 am
জার্মানির ম্যুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু হতে চলেছে ইসলামি ধর্মতত্ত্বের পূর্ণাঙ্গ অনুষদ৷ ইউরোপের কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম এ পদক্ষেপ ইতিমধ্যে ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে৷
জার্মানির পশ্চিমাঞ্চলের শহরের এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ক্যাম্পাস অব রিলিজিয়ন্স’, অর্থাৎ ধর্ম বিষয়ক ক্যাম্পাসের কাজ শুরু হয় ২০২১ সালে৷ নির্মাণকাজের অনেকটাই এখনো চলমান৷ কাজ চলছে ২০২৭ সালে উদ্বোধনের লক্ষ্য নিয়ে৷ নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ চললে আগামী বছরের মধ্যে ক্যাথলিক, প্রোটেস্ট্যান্ট ও ইসলামি ধর্মতত্ত্ব অনুষদ এবং ধর্ম নিয়ে পড়াশোনার বিভাগ পুরোদমে কাজ শুরু করবে সেখানে৷
কাজ শেষ হলে জার্মানি তো বটেই, এমনকি ইউরোপেরও প্রথম কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু হবে ইসলামি ধর্মতত্ত্বের স্বতন্ত্র অনুষদ৷
শিক্ষাবিদ মুহানাদ খোরচিদে তাই খুব গর্বিত৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘‘আমার জন্য ইতিহাসের অনন্য এক অধ্যায়ের অংশ হতে পারা সৌভাগ্যের বিষয়৷” ম্যুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫ বছর ধরে কাজ করছেন৷ সেই অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, এমন অর্জনের সঙ্গে থাকতে পেরে তিনি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ৷ ৫৪ বছর বয়সি মুহানাদ খোরচিদে বলেন, ‘‘এই অনন্য সুযোগের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করতে চাই আমরা৷ কথা বলতে চাই ইসলামের মুক্তমনা ও আলোকিত দৃষ্টিভঙ্গির পক্ষে৷” খোরচিদে মনে করেন, ‘‘এই অনুষদের কার্যক্রম শুধু ইউরোপে নয়, বরং সমগ্র মুসলিম বিশ্বেই প্রভাব ফেলবে৷”
অনুষদের মর্যাদা লাভ গুরুত্বপূর্ণ এক মাইলফলক
গত ১লা জুলাই থেকে মুহানাদ খোরচিদের জন্য হয়েছে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা৷ আপাতত ম্যুনস্টারের পাউলুস ক্যাথেড্রালের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী কার্যালয়ে নিজের কাজ চালিয়ে যাবেন৷ এতদিন সমাজবিজ্ঞানী ও ধর্ম বিষয়ক শিক্ষক হিসেবে ম্যুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইসলামিক থিওলজি (জেডআইটি)-র নেতৃত্ব দিলেও এখন নবপ্রতিষ্ঠিত ইসলামি ধর্মতত্ত্ব অনুষদের প্রতিষ্ঠাতা ডিনের দায়িত্বে রয়েছেন তিনি৷
পূর্ণাঙ্গ অনুষদের মর্যাদাপ্রাপ্তির ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামি ধর্মতত্ত্ব বিশেষ অবস্থান পেলো৷ এ অনুষদ ম্যুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক নীতিমালার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক৷ এতদিন জেডআইটি-র অনুষদের মর্যাদা ছিল না৷ এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক কার্যক্রমের জন্য অন্য একটি অনুষদের ওপর নির্ভর করতে হতো৷
ইসলামি ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার
স্বতন্ত্র অনুষদ হিসেবে ইসলামি ধর্মতত্ত্ব বিভাগ এখন ডক্টরেট ও উচ্চতর একাডেমিক ডিগ্রি (হ্যাবিলিটেশন) দিতে পারবে৷ ফলে শিক্ষাবিদদের নতুন এক প্রজন্ম গড়ে তোলায় এবং দীর্ঘস্থায়ী একাডেমিক ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করতে পারবে এ অনুষদ৷ এছাড়া পূর্ণাঙ্গ অনুষদের মর্যাদা পাওয়ায় গবেষণার জন্য বাইরের উৎস থেকে অর্থায়ন পাওয়াও এখন সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে৷
মুহানাদ খোরচিদের চোখের সামনেই এমন আশার ধারক হয়ে উঠেছে তার অনেক চেনা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামি ধর্মতত্ত্ব অনুষদ৷ ২০১২ সালে জেডআইটি-র পথচলা শুরুর সময়ের তুলনায় অনেক এগিয়েছে কাজ৷ ১৪ বছর আগে জেডআইটিতে কর্মী ছিল মাত্র তিনজন আর শিক্ষার্থী ১৫ জন৷এখন এই কেন্দ্রে অধ্যাপক রয়েছেন আটজন, কর্মী ৫০ জনেরও বেশি৷ মুহানাদ খোরচিদের আশা, আগামী বছরগুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও ৫০০ ছাড়িয়ে যাবে৷
এই অনুষদে পড়াশোনা করলে শিক্ষার্থীদের চাকরি পেতেও কোনো সমস্যা হবে না বলে মনে করেন তিনি৷ কারণ, জার্মানির সব সরকারি স্কুলেই ইসলামি ধর্মীয় শিক্ষা চালু হচ্ছে, এর ফলে যোগ্য ধর্মীয় শিক্ষকের চাহিদাও ক্রমশ বাড়ছে৷
জার্মানির সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য নর্থ রাইন-ওয়েস্টফালিয়ার কথাই ধরা যাক৷ উল্লেখ্য, ম্যুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয় এই রাজ্যেই অবস্থিত৷ সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ রাজ্যে তিন হাজারের মতো ধর্মীয় শিক্ষকের প্রয়োজন, অথচ আছে মাত্র ৩৩০ জনের মতো শিক্ষক৷ সুতরাং স্নাতকদের জন্য শিক্ষক হবার সুযোগ যে রয়েছে তা বলাই বাহুল্য৷
২০২৭ সাল থেকে ম্যুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ইসলাম ও সমাজকর্ম’ শিরোনামে একটি মাস্টার্স প্রোগ্রাম চালুর পরিকল্পনা করছেন মুহানাদ খোরচিদে৷ এর মাধ্যমে মুসলিম তরুণ-তরুণীদের নানা ধরনের কাজে উৎসাহিত করতে চান তিনি৷ ইসলামি ধর্মতত্ত্ব অনুষদের প্রতিষ্ঠাতা ডিন মুহানাদ খোরচিদে জানান, বর্তমানে জার্মানিতে বিশেষ করে যুব সেবা, হাসপাতালে ধর্মীয় পরামর্শদান (চ্যাপলেইনসি) এবং বয়স্কদের সেবার মতো ক্ষেত্রগুলোতে বিশেষায়িত শিক্ষার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে৷
তিনি আরো জানান, ম্যুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন এই অনুষদের খবরে অনেকের ব্যাপক আগ্রহ দেখে তিনি অভিভূত৷ আফ্রিকা ও এশিয়ার গণমাধ্যমও বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে৷ সবচেয়ে বেশি মুসলিমের দেশ ইন্দোনেশিয়ার গণমাধ্যমেও ম্যুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের এই খবর এসেছে বলে জানালেন তিনি৷
মুহানাদ খোরচিদে বলেন, ‘‘মানুষ আসলে একটি উদারপন্থি ইসলাম দেখতে চায়৷” তিনি মনে করেন, ইসলামের ভবিষ্যৎ বিকাশের বিষয়ে জার্মানির বাইরেও যে বিতর্ক চলছে ম্যুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয় ভবিষ্যতে তাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে৷
ম্যুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখপাত্র নরবার্ট রোবার্স ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘ধর্মতত্ত্বের ক্ষেত্রে ম্যুনস্টারের অবস্থান ঐতিহ্যগতভাবেই শক্তিশালী৷” এখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো দুটি খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্ব অনুষদ ও ইসলামি ধর্মতত্ত্ব বিভাগকে একই ছাদের নিচে নিয়ে আসা হচ্ছে৷ সেখানে থাকবে গ্রন্থাগার ও ক্যাফেটেরিয়া৷ নরবার্ট রোবার্স মনে করেন, ‘‘এর বড় ধরনের প্রতীকী তাৎপর্য রয়েছে৷”
সারায়েভোতে দীর্ঘদিন ধরেই ইসলামি ধর্মতত্ত্বের একটি অনুষদ রয়েছে৷ তবে সেই অনুষদ কোনো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোর অংশ নয়৷ তাই ম্যুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামি ধর্মতত্ত্বের অনুষদই এক্ষেত্রে ইউরোপের সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে প্রথম৷ রোবার্স জানান, আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান মিলনায়তনে হবে এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন৷
মধ্য-ডানপন্থি দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ন (সিডিইউ)-এর রাজনীতিবিদ আনেট শাভান ২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত জার্মানির কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন৷
জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইসলামি ধর্মতত্ত্বের বিভাগ চালুর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তার৷ গত জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে কোলনভিত্তিক ক্যাথলিক সংবাদমাধ্যম ডমরাডিও-তে একটি নিবন্ধ লিখেছেন তিনি৷ সেখানে ইসলামি ধর্মতত্ত্ব অনুষদ চালু হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, নতুন এই অনুষদ সারা ইউরোপেই স্বীকৃতি পাবে৷
সূত্র: ডয়চে ভেলে
Posted ১১:০২ এএম | মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬
dainiksarod | Pijush Kanti Acharya