স্বায়ম্ভব
প্রিন্ট
সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : 1:45 pm
সকাল সাতটা বাজতে না বাজতেই এলার্ম ঘড়ির চিৎকার চেঁচামেচি শুরু হয়ে যায়। এলার্ম ঘড়ি সংসারের ওই একটা বিরক্তিকর সদস্যের মতো, যাকে কেউ সহ্য করতে পারেনা, কিন্তু তাকে ছাড়া সংসার অচল। আজ প্রায় ৪ বছর যাবত চাকরি করছে শরৎ। এই এলার্ম ঘড়ি না থাকলে একদিনও অফিস পৌঁছাতে পারতো না সে।
ধপ করে এলার্ম বন্ধ করে বসে পড়ে। বাথরুমে আধা ঘন্টা কাটানো শরৎের অভ্যাস। এর মধ্যে সে দাঁত মাজা, পেট সাফ করা, স্নান করা সবই শেষ করে। এরপর ফ্রিজ থেকে বের করে দুটুকরো ব্রেড। এক চামচ মাখন। অনেকক্ষন লাগিয়ে ঝিমোতে ঝিমোতে মাখন ব্রেডে লাগায় সে। তারপর Fork-knife নিয়ে আস্তে আস্তে গলধ:করন শুরু করে। নিজেকে খুব পশ মনে হয় এভাবে খেলে। জামাকাপড়ের ব্যপারে খুব সচেতন শরৎ। ভালো জামাকাপড় ভালো রুচির পরিচয় দেয়। প্রতিদিনই ফর্মাল পড়ে সে।
আলমারীতে সাতটা শার্ট, সাতটাই সাদা। খুব সুন্দর করে ফর্মাল প্যান্টের সাথে ইস্ত্রি করা একটা শার্ট গায়ে দেয় সে। চৌকষ হাতে টাই লাগায়। এই পর্যন্ত শরৎ আর বাকি ১০ টা চাকুরিজীবীর মধ্যে খুব একটা ফারাক নেই। ফারাক শুরু হয় এখান থেকে। ড্রয়ার থেকে অতি পুরোনো জঙ্কার ধরা একটা রিভলবার বের করে শরৎ। ডান হাতে রিভলবারটা নিয়ে এর সিলিন্ডারটা খোলে সে। সিলিন্ডারে ৫ টা চেম্বার। ডান হাতে একটা পুরোনো বুলেট। সে বুলেটটা একটা চেম্বারে ঢোকায়। এরপর সিলিন্ডারটা লাগিয়ে একবার ঘুরায়। শরৎ তার জীবনে অনেক প্রজাতির অঙ্ক কষেছে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ঘৃণা হয়ত সম্ভাবনার অঙ্ককেই করে। সিলিন্ডারের ৫ টা চেম্বারের মধ্যে শুধু একটায় বুলেট থাকলে একবার ট্রিগার চাপলে বুলেট ফায়ার হওয়ার সম্ভাবনা ১/৫। সে রিভলবারটাকে নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ায়। ফর্মাল জামা পরিহিত এক যুবক রিভলবার হাতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। রিভলবারটাকে মাথায় ঠেকায় সে। মনে মনে বলে “ওয়ান বাই ফাইভ, ওয়ান বাই ফাইভ, ওয়ান বাই ফাইভ”৷ ট্রিগার চাপলে ‘চুক’ করে একটা আওয়াজ হয়। বুলেট ফায়ার হয়নি। শরৎ খুব স্বাভাবিকভাবে চেম্বার থেকে বুলেটটা বের করে রিভলবার আর বুলেট দুটোকেই আলাদা আলাদা দুটো ড্রয়ারে রেখে দেয়।
একটা পড়ার টেবিল আছে শরৎের৷ সেখানে কোন বইখাতা নেই। শুধু একটা ডায়েরি। সেখানে লেখে সে
” Date – 22/05/2025
Not Allowed today”.
পুরো ডায়েরিটা একবার উলটে পালটে দেখে সে। পুরো ডায়েরি জুড়েই শুধু তারিখ আর, “Not Allowed today” লেখা। নিজেই ভাবে শরৎ৷ সম্ভাবনা অঙ্ক হিসেবেও বোগাস, বাস্তবেও বোগাস। নয়ত আজ অব্দি বুলেট ফায়ার হলো না কেন?
এই স্বল্প সময়ের অদ্ভুত আচরন, এই রাশিয়ান র্যুলেট বাদে বাকি সবই স্বাভাবিক শরৎের জীবনে। সে কঠোর পরিশ্রমী। সারাদিন কম্পিউটারের সামনে টুক টুক করে কি লেখে কে জানে। সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরে সে৷ এসে আবারও স্নান করে। খাবার বানায়। টিভি চালায়, টিভি দেখতে দেখতে খায়। এই কিছু মুহূর্ত খুব প্রিয় শরৎের। সমস্যা শুরু হয় রাতে। শরৎের শরীর ক্লান্ত। কিন্তু তার ঘুম আসে না। সে চুপচাপ নীরবতায় মাথার উপর ঘুরতে থাকা ফ্যানের দিকে তাকিয়ে থাকে। বাইরের ল্যাম্পপোস্টের আলো ভেতরে ঢোকার কারনে স্পষ্ট দেখা যায় ফ্যানের পাখাগুলোকে। ঘূর্ণন গণনার চেষ্টা করে শরৎ। ক্যাঁচর ক্যাঁচর শব্দে ঘুরছে পাখা, এক দুই তিন চার পাঁচ ছয় সাত আট নয়…..কোন এক সংখ্যায় এসে গণনা বন্ধ হয়ে যায় শরৎের। ঘুমিয়ে পড়ে সে। সে ঘুম খুব যে স্বস্তিবোধ করায় তা না। প্রতিরাতে ভয়ঙ্কর দু:স্বপ্ন দেখে শরৎ। প্রতিরাত একই দু:স্বপ্ন। স্বপ্নে নিজের ছেলেবেলাকে দেখতে পায়। তার ছোট্ট শরীরের উপর বিশাল একটা মানুষ চেপে বসে। গলা চেপে ধরে সে। তার উদ্দেশ্য ছোট্ট শরৎকে মেরে ফেলা। মনে হয় এই ভেঙে যাবে গলার হাড়।
রাত পেরোবার আগেই আঁতঙ্কে জেগে উঠে শরৎ। কিন্তু বুকের ভারটা কমে না। এখানেই ছিলো সে, লুকিয়ে গেছে হয়ত।
সকাল সাতটায় আবারও চেঁচিয়ে উঠে এলার্ম। আবারোও সেই একই রুটিন। বাথরুমে আধা ঘন্টা কাটাও, Fork Knife দিয়ে খাবার খাও, ফর্মাল জামাকাপড় পড়ো। এরপর আবারও সে রাশিয়ান র্যুলেট। মনে মনে আবারও সেই “1/5, 1/5, 1/5″। আজোও গুলি ফায়ার হয়নি। আজও ডায়েরি তে “Not Allowed Today” লিখার কাজ শেষ করলো শরৎ।
সেদিন এক কলিগ মেয়ে তাকে প্রথমবার ডাক দেয়।
“আপনাকে অনেক বছর ধরেই দেখছি কিন্তু কখনো কথা হয়নি।”
নম্রভাবে উত্তর দেয় শরৎ, “যাক, কেউ তো আমায় notice করলো।”
“কি নাম আপনার?”
মৃদু হেসে বলে, “আমার নাম শরৎ। আপনার?”
“আমার নাম শ্রেয়া।”
বাড়ি ফেরার পথে এক বাচ্চা ছেলে হাত ধরে টান দেয় শরৎের।
“তুমি কি ক্যাডসের ফিতা বাঁধতে পারো?”
-“হ্যাঁ, পারি তো।”
“একটু বেঁধে দিবে?”
ক্যাডসের ফিতা বেঁধে দেয় শরৎ। ছেলেটা হাসি দিয়ে শরৎকে একটা চকলেট দেয়। শরৎ চকলেট নিতেই বাচ্চাটা, “Thank you”-বলে দৌড় লাগায়। শরৎ তাকিয়ে থাকে চকলেটের দিকে।
রাতে ঘুমের মধ্যে আবারোও কেউ তার বুকে চেপে বসলো। শরৎ আবারোও দেখতে পায় ফ্লোরে শুয়ে থাকা ছোট্ট নিরীহ শরৎকে। কোন এক বিশাল জানোয়ার চেপে বসেছে শিশু শরৎের উপর। গলার হাড় ভেঙে ফেলছে সে। হাড়ে মট মট করে শব্দ হয়। ঘুমের মধ্যেই সে বলে উঠে, ” আমি তোমার পরিবার”- জানোয়ারটা হাওয়ায় মিলিয়ে যায়।
ঘুম ভেঙে যায় শরৎের। দরদর করে ঘামছে সে। কোথাও যেন গুন গুন করে কান্নার আওয়াজ পায় শরৎ। ঘরে যে অদৃশ্য জানোয়ারটা বাস করে, সে কি কোনভাবে মনে আঘাত পেয়েছে? জানোয়াররাও কি কষ্ট পায়। হিংস্রতার উর্ধ্বেও কি কিছু আছে তাদের অন্তরে?
সকালে ফর্মাল ড্রেস পড়ে আয়নার সামনে রিভলবার হাতে কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থাকে শরৎ। রিভলবার মাথায় ঠুকে মনে মনে “1/5, 1/5, 1/5″- বলতে বলতেই হঠাৎ যেন শুনতে পায় ” আমার নাম শ্রেয়া”। চারপাশে তাকায় শরৎ। কোথাও তো কেউ নেই৷ ভুল শুনেছে নিশ্চয়ই। কোনরকম চিন্তা ছাড়াই ট্রিগার চাপে সে। না, আজও গুলি বের হয়নি। ডায়েরিতে লেখে, “Date- 24/05/2025, Not allowed today”.
অফিসে কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যায় শরৎ। কফি ম্যাশিনে কফি নিতে গিয়ে আবারও শ্রেয়ার সাথে দেখা।
” কি ব্যাপার, আপনার শার্টের ইস্ত্রি ভেঙে গেছে মনে হচ্ছে?”
অবাক হয়ে তাকায় শরৎ। আরে! গতকালের শার্ট গায়ে দিয়েই চলে এসেছে শরৎ৷ কি বলবে বুঝতে না পেরে বলে, “সরি, আর এমন হবে না।”
শ্রেয়া হাসতে হাসতে বলে, “এমন রোবটের মতো বাঁচলে হবে? ইস্ত্রি ভাঙতেই পারে।” এর মধ্যেই অনেক্ষন গরম কাপ ধরে রাখায় হাত থেকে কফির কাপ পড়ে যায়। কিছু কফি ছিটে পড়ে শ্রেয়ার জামায়।
শরৎ অস্বস্তির সাথে বলে, “সরি সরি। আমি আসলে…”
শ্রেয়ার হাসি থামেনা। সে হাসতে হাসতেই বলে, “আরে সরির কি হলো? ভুল হতেই পারে। সে ভুল নিয়ে পড়ে থাকলে হবে না। আমায় একটা টিস্যু দিন।”- টিস্যু বক্স থেকে টিস্যু দেয় শরৎ।
” রোবট না হয়ে মুক্তভাবে বাঁচুন। ভুলগুলোকে ভুলে যান। জীবনের কষ্টগুলো ঝেড়ে ফেলুন। জীবন থেকে দু:খ বিয়োগ করলে কি থাকে জানেন?”
-“সুখ থাকে।
“Exactly”.
শ্রেয়া হাসতে হাসতে চলে যেতে থাকে। পেছন থেকে নার্ভাসভাবে ডাক দেয় শরৎ, ” শ্রেয়া।”
শ্রেয়া নিজেও একটু চমকে উঠে। সে ফিরে তাকায়।
আমতা আমতা করে শরৎ বলে, “আপনার ফোন নম্বরটা দেওয়া যাবে?”
বাড়ি ফেরার পথে খুব বৃষ্টি। শরৎ এক আবছায় দাঁড়ায়।
সাথে একটা ফুলবিক্রেতা মেয়ে দাঁড়ানো। শরৎের মুখে মৃদু হাসি। সে তার হাতে মোবাইলটার দিকে তাকিয়ে থাকে। ফুলবিক্রেতা মেয়েটা শরৎের দিকে তাকিয়ে থাকে। বলে- “তোমার কি মন অনেক ভালো।” শরৎ নিচে তাকিয়ে দেখে একটা ছোট্ট বাচ্চা মেয়ে। ফুল বিক্রি করছে। শরৎ হাসি দিয়ে বলে, “হ্যাঁ।”
মেয়েটা শরৎকে একটা টিউলিপ ফুল দেয়।
“নাও, এটা তোমার জন্য।”
-“আমার কাছে তো টাকা নেই।”
“এটা গিফট।”
বলে মেয়েটা বৃষ্টিতেই হেঁটে চলে যেতে থাকে। পেছনে ফিরে আবারও বলে, “তুমি কি আরোও খুশি হতে চাও?”
শরৎ বলে, “আমি পৃথিবীর সব সুখ পেতে চাই।”
“তাহলে আসো, বৃষ্টিতে ভিজি।”
শরৎ নিজের ফর্মাল ব্লেজারের তোয়াক্কা না করে বৃষ্টিতে ভিজে। ব্লেজার ভিজে পুরো দফারফা হয়ে যায়। কিন্তু সে আকাশের দিকে হাত মেলে ধরে। জমে থাকা পানিতে ঝাঁপ মেরে বাচ্চা মেয়েটাকে ভিজিয়ে দেয়। মেয়েটাও একই কাজ করে। শরৎের এমন বাচ্চামি দেখে হাসে দূর থেকে শ্রেয়া। এই শরৎকে কখনোও দেখেনি সে।
আজ রাতে কোন রূপকথা নেই। আজ নিশ্চয়ই সে জানোয়ার আসবে না৷ আসলেও, সে তার নিজের রূপে আসবে। ছদ্মবেশে না৷ হাসিখুশি মন নিয়েই ঘুমাতে যায় শরৎ। কিন্তু স্বপ্ন শরৎের পিছু ছাড়ে না৷
শরৎ দেখতে পায়, বিশাল একটা লোক ঘরের জিনিসপত্র সব ভেঙে ফেলছে। চিৎকার করছে, “আমার সব শেষ। আমি নি:স্ব হয়ে গেলাম। আমার আর কিছু নেই। আমি আমার এই পরিবারকে এই অকল্পনীয় ঋন থেকে কিভাবে বাঁচাবো? ছোট্ট শরৎ সাহস পায় না লোকটার দিকে এগোয়। লোকটা ঘরের সব জিনিসপত্র আছড়ে ফেলছে।
লোকটা চিৎকার করছে আর বলছে, ” আমি সব হারালাম।”
শরৎ ভয়ে কাবু হয়ে থাকা একটা মহিলাকে দেখতে পায়। এটা কি, মা? মা ভয়ে কুঁকড়ে গেছে। বিশাল আকৃতির লোকটা ড্রয়ার থেকে একটা রিভলবার বের করে। রিভলবারটায় সিলিন্ডার খুলে প্রত্যেকটা চেম্বারে একটা একটা করে বুলেট ঢোকায়। তারপর পেছন ফিরে তাকায়। ধড়াশ করে শব্দ হয়। শরৎ দেখতে পায় বুলেটটা সে মহিলাটার কপাল ভেদ করে ওয়ালে গিয়ে লেগেছে। মা কি মরে গেলো। দৌঁড়ে টেবিলের নিচে লুকায় শরৎ। শরৎের ছোট ভাই আর বোন দৌড়ে পালাতে থাকে। বিশাল আকৃতির জানোয়ারটার বিশাল পায়ের সাথে দৌড়ে টিকতে পারেনা ভাইবোনেরা। চোখের সামনে দুই ভাইবোনকেই গুলি করে মারলো জানোয়ারটা। এরপর শরৎের দিকে তাক করে। শরৎ দৌড়ে পালায়। টেবিলে থাকা ফুলদানীটা ছুঁড়ে মারে। মাথা ফেটে যায় জানোয়ারটার। সে দৌড় দিয়ে শরৎের ছোট্ট শরীরটাকে চেপে ধরে। উঠে বসে শরৎের বুকের উপর। গজরাতে গজরাতে গলা চিপে ধরে ছোট্ট শরৎের। এই বুঝি গলার হাড় ভেঙে যাবে। যতটুকু শক্তি আছে, ততটুকু শক্তি দিয়েই সে বলে, “আমি তোমার পরিবার”। জানোয়ারটা শরৎের গলা ছেড়ে দেয়৷ শরৎ উঠে দাঁড়ায়। সে বলে, “বাবা?”
বাবার হুঁশ নেই। সে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে।
“আমি আমার নিজের পরিবারকে নিজেই খুন করলাম। আমি একটা জানোয়ার। আমি একটা জানোয়ার।”
শরৎ বাবার হাত ধরে বলে, “বাবা কান্না করোনা।”
বাবা শরৎের দিকে তাকায়। সে উঠে দাঁড়ায়। হাত দিয়ে চোখের জল মুছে বলে, “আমায় ক্ষমা করো, শরৎ।”
বলেই সে নিজের মাথায় গুলি চালিয়ে দেয়।
শরৎ দেখতে পায় তার বাবার মাথার আরেক পাশ দিয়ে বুলেটটা বের হয়ে গেছে। ছিদ্র থেকে দর দর করে রক্ত পড়ছে। শরৎ নিজের চেহারায় ধরে দেখে তার নিজের চেহারাও রক্ত আর ঘামে একাকার হয়ে গেছে। একটা ঝড় এসেছিলো, সব ভেঙে গিয়েছিলো, ধ্বংসাবশেষ রেখে গেছে। শরৎ বাবার হাত থেকে রিভলবারটা নেয়। সিলিন্ডারটা খুলে দেখে আর একটা বুলেট আছে। আশ্চর্য! ভয় লাগছে না কেন? সে নিজের মাথায় বন্দুকটা ধরে। ট্রিগারে আঙুল, মনে মৃত্যু….
স্বপ্ন ভেঙে যায় শরৎের। দেখে সামনেই একটা বিশাল আকৃতির জানোয়ার দাঁড়ানো। আজ সে বুকে চেপে বসেনি। ধপ ধপ করে তার পায়ের আওয়াজ হয়। সে হাঁটতে হাঁটতে শূন্যে মিলিয়ে যায়।
স্বপ্নটার জন্য মনমরা হয়ে থাকে শরৎ। সকালে রেডি হয়ে রিভলবারের সিলিন্ডার খুলে একটা ফাঁকা চেম্বারে বুলেটটা ঢোকায়। তারপর সিলিন্ডারটাকে ঘোরায়। মনে মনে অনেককিছু ভাবে শরৎ। কোন এক কারিগর একদিন অনেক যত্ন নিয়ে এই বুলেটটা বানিয়েছিলো। সে বুলেটে হয়ত শরৎের নাম ছিলো। যদি থেকে থাকে, তবে আজই তার প্রমান হোক৷
“1/5, 1/5, 1/5”
ট্রিগার চাপে শরৎ। না, আজোও গুলি বেরোয় নি। আয়নায় দেখতে পায় পেছনে খাওয়ার টেবিলে রাখা সে টিউলিপ ফুল। সেটাকে বুক পকেটে ভরে শরৎ। আজ ব্লেজার গায়ে দেয়নি সে। বের হওয়ার আগে ডায়েরিতে লেখে, “Date -25/01/2025. Not allowed today.”
দুপুরে কাজের এক ফাঁকে শ্রেয়া আসে শরৎের ডেস্কে। এসে একটা চিরকুট ধরিয়ে দেয়।
চিরকুটে লেখা, “আমরা না-হয় একটা অপরাহ্ন একসাথে কাটাই?”
উত্তরে বুকপকেটে রাখা টিউলিপ ফুলটা দেয় শরৎ শ্রেয়াকে। শ্রেয়া একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে সেখান থেকে চলে আসে।
বাড়ি ফেরার পথে দেখে একটা বিড়াল শরৎের পিছু পিছু হাঁটছে। শরৎ একটা চিপ্স কিনে বেড়ালটার দিকে ঢিল দেয়। বিড়ালটা পটাস পটাশ করে চিপ্স খায়। বেশ মজা পায় শরৎ। বেড়ালটার কাছে যায় শরৎ৷ চিপ্সটা দিয়ে দেয়৷ বেড়ালটার মাথায় হাত বুলায় শরৎ৷ বহুদিন পর এত মমতা অনুভব করে শরৎ। পরম যত্নে কোলে তুলে নেয় বেড়ালটাকে৷ হঠাৎ-ই কোত্থেকে একটা মিষ্টি ঠান্ডা বাতাস বইতে শুরু করলো। হালকা হাসে শরৎ। জীবনটা এতটাও খারাপ না।
সেদিন রাতে কোন দু:স্বপ্ন আসেনি শরৎের। হয়ত জানোয়ারটা আজীবনের মতো চলে গেছে। সকালে রিভলবারের চেম্বারে আবারোও বুলেট ঢোকায় শরৎ। এর মধ্যেই একটা ফোন আসে৷ শ্রেয়ার ফোন নম্বর।
“আজ আমরা একসাথে লাঞ্চ করছি তো?”
“হ্যাঁ”।
সে জানে আজোও ট্রিগার চাপলে গুলি আসবে না। মাথায় বন্দুকটা ধরে আয়নার সামনে বেশ কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থাকে শরৎ। কিন্তু আজ হাত কাঁপছে শরৎের। কিসের ভয়? ভয় কি জিনিস তা তো শরৎ কবেই ভুলে গেছে, তাহলে আজ কিসের দ্বিধা। মাথা থেকে রিভলবার নামায় শরৎ। মৃদু হাসে। উত্তর কি হবে তা তো আমি জানিই। 1/5 my foot.”-বলে সে আয়নার দিকে তাক করে ট্রিগার চাপে।
ধড়াশ করে শব্দ হয়। আজ অবশেষে বুলেট বেরিয়েছে। শরৎের হাত থেকে রিভলবারটা পড়ে যায়। সে দেখতে পায় আয়নায় বিশাল একটা ছিদ্র হয়ে গেছে। ভাঙা আয়নায় নিজের ভাঙা ভাঙা প্রতিচ্ছবি দেখতে পায় শরৎ। একটু একটু করে আয়নাটা পুরোপুরি ঝরে পড়ে। মাটিতে বসে পড়ে শরৎ৷ চিৎকার করে হাসতে থাকে সে। এক অদম্য উন্মাদনা ভর করেছে তাকে। সে হাসি থামাতে পারে না। ভাগ্য কত বিচিত্র৷ সারাজীবন শরৎ ভেবে এসেছে এই বুলেটে শরৎের নাম লেখা। আজ একটা ভ্রান্তি দূর হলো।
শরৎ আস্তে আস্তে গিয়ে টেবিলে বসে। টেবিলে রাখা ডায়েরিটা খুলে লেখে, ” Date – 25/05/2025. Not allowed today. Never will.”
The End.
Posted ১:৪৫ পিএম | সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬
The Daily Sarod | Pijush Kanti Acharya