বিষমুক্ত মাছ উৎপাদনে স্বপ্নপুরী ফিসারি

নিজস্ব প্রতিবেদক   প্রিন্ট
শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬   সর্বশেষ আপডেট : 11:32 am

বিষমুক্ত মাছ উৎপাদনে স্বপ্নপুরী ফিসারি

তিতাস নদীর পূর্ব পাশে চর সুহিলপুর মৌজা। বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে সারি সারি পুকুর। কোথাও ছোট মাছের রেণু, কোথাও আবার পুকুরের পানিতে দল বেঁধে ছুটে বেড়াচ্ছে পাঙ্গাস, তেলাপিয়া, রুই, কাতলা, ব্রিগেড, মৃগেল ও কার্ফোসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। এসব পুকুরকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে ‘স্বপ্নপুরী ফিসারি’।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আমিন ২০১৮ সালে প্রায় ৫৩ বিঘা জমির পাঁচটি পুকুর নিয়ে মাছ চাষ শুরু করেন। পাঁচটি পুকুরের মধ্যে তিনটি বড় এবং দুটি ছোট। ছোট পুকুর দুটিতে উৎপাদন করা হয় মাছের রেণু ও পোনা। পরে সেসব পোনা বড় পুকুরে ছেড়ে দেওয়া হয়।
স্বপ্নপুরী ফিসারির উদ্যোক্তা মোহাম্মদ আমিন জানান, প্রচলিত পদ্ধতিতে বাজারজাত করা ফিডের ওপর নির্ভর না করে মাছের জন্য নিজেরাই খাবার তৈরি করেন। ভুট্টা, খৈল, আটা, চালের গুঁড়া, ধানের কুঁড়া, ডিআরবি কুঁড়া, সয়াবিন বীজের গুঁড়া, শুঁটকির গুঁড়া, সয়াবিন তেল, ডিটিএস গুঁড়া, অ্যাকুয়া ভিটামিন ও ক্যালসিয়াম লবণসহ বিভিন্ন উপাদান নির্দিষ্ট অনুপাতে মিশিয়ে মেশিনের মাধ্যমে তৈরি করা হয় এই খাবার।
উদ্যোক্তার দাবি, নিজেদের তৈরি এই খাবার ব্যবহার করায় মাছ উৎপাদনে ক্ষতিকর উপাদান এড়িয়ে চলা সম্ভব হচ্ছে এবং তারা ‘বিষমুক্ত’ মাছ উৎপাদনের চেষ্টা করছেন।
ফিসারি কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রথমে ছোট পুকুরে রেণু থেকে পোনা তৈরি করা হয়। প্রায় দুই মাসে এসব পোনা তিন থেকে চার ইঞ্চি আকার ধারণ করলে বড় পুকুরে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে আরও চার থেকে পাঁচ মাস লালন-পালনের পর মাছ বিক্রির উপযোগী হয়। এ সময় কোনো কোনো মাছের ওজন দুই থেকে আড়াই কেজি পর্যন্ত হয়।
প্রতি কিস্তিতে প্রায় ৫০ হাজার পোনা পুকুরে ছাড়া হয়। পরিচর্যা ও লালন-পালনের পর চার থেকে পাঁচ মাসে এর মধ্যে ৪০ হাজারের বেশি মাছ বিক্রির উপযোগী হয়ে ওঠে। সব মিলিয়ে একেকটি কিস্তিতে উৎপাদন হয় প্রায় ৬০ টন মাছ।
স্বপ্নপুরী ফিসারির হিসাবে, প্রতি কিস্তিতে উৎপাদিত প্রায় ৬০ টন মাছ গড়ে এক কোটি টাকায় বিক্রি হয়। এর বিপরীতে উৎপাদন ব্যয় পড়ে প্রায় ৬০ লাখ টাকা। বর্তমানে ফিসারিতে সার্বক্ষণিক পাঁচজন শ্রমিক কাজ করছেন।
পাঙ্গাস ও তেলাপিয়ার পাশাপাশি এখানে চাষ করা হচ্ছে বিভিন্ন জাতের কার্প মাছ। রুই, কাতলা, ব্রিগেড, মৃগেল ও কার্ফোর সঙ্গে বাটকী, সরপুঁটি ও আইর মাছও রয়েছে। নিজস্ব পুকুরে রেণু উৎপাদন থেকে শুরু করে পোনা বড় করা এবং পরবর্তী সময়ে বড় পুকুরে মাছ চাষ—পুরো প্রক্রিয়াটি নিজেদের ব্যবস্থাপনাতেই পরিচালনা করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাজারেও স্বপ্নপুরী ফিসারির মাছের চাহিদা রয়েছে বলে জানান উদ্যোক্তা মোহাম্মদ আমিন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর ও আশপাশের এলাকায় সরবরাহ করা হয় এসব মাছ।
মোহাম্মদ আমিন বলেন, মাছ চাষকে আরও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। তবে এ খাতে উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে পরামর্শ, নিয়মিত খামার পরিদর্শন ও কারিগরি সহযোগিতা বাড়ানো দরকার।
মৎস্য খামারের নিরাপত্তার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর মতে, বিভিন্ন সময়ে পুকুরে বিষ প্রয়োগ করে মাছ নিধনের খবর পাওয়া যায়। এতে একজন খামারির দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও বিনিয়োগ এক মুহূর্তে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই মৎস্য খামারকে দুর্বৃত্তদের হাত থেকে সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা ও বিশেষ আইনি সুরক্ষা প্রয়োজন।
উদ্যোক্তাদের মতে, আধুনিক ব্যবস্থাপনা, মানসম্মত খাবার, কারিগরি পরামর্শ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে দেশের মৎস্য খাত আরও সমৃদ্ধ হতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানুষের জন্য নিরাপদ মাছের জোগান বাড়াতেও এ ধরনের উদ্যোগ ভূমিকা রাখতে পারে।

Facebook Comments Box

Posted ১১:৩২ এএম | শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

The Daily Sarod |