দেড় বছর ধরে বন্ধ সড়কের কাজ, ঠিকাদার তুলে নিলেন ৮ কোটি টাকা

বিশেষ প্রতিনিধি   প্রিন্ট
শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬   সর্বশেষ আপডেট : 3:00 pm

দেড় বছর ধরে বন্ধ সড়কের কাজ, ঠিকাদার তুলে নিলেন ৮ কোটি টাকা

ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের অদূরে তিতাস নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত কাশিনগর গ্রাম। সেখানে বসবাস হাজারো ঋষি পরিবারের৷ কোন সড়ক ব্যবস্থা না থাকায় তিতাস নদীর পূর্ব পাড়ের বসবাস করা অন্যান্য বাসিন্দাদেরও শহরের সাথে যোগাযোগের একমাত্র বাহন নৌকা। তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করতে সরকার এমএস খাল টু সিমনা সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু করে। কিন্তু সেই সড়কের কাজের দুইবার মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও কাজ অর্ধেকও করেননি ঠিকাদার। কিন্তু কাগজে কলমে ৮৫ শতাংশ কাজের অগ্রগতি দেখিয়ে ৮ কোটি টাকার বেশি উত্তোলন করে নিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। দেড় বছর ধরে বন্ধ রয়েছে এই সড়কের নির্মাণ কাজ। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের দাবি, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দুইবার শোকজ করা হয়েছে।

এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে ৮ কোটি ৩৩ লাখ টাকা ব্যয়ে জেলা শহরের তিতাস নদীর পূর্ব দিকে এমএস খাল টু সিমনা সিসিবি সড়কের কাজ শুরু করা হয়। কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চাঁদপুর জেলার গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীন অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় কাজটি শুরু করে এলজিইডি। দুটি ভাগে এই সড়কের দৈর্ঘ্য দুই হাজার ৩৮০ মিটার ধরা হয়। কাজটি পায় বরেন্দ্র কন্সট্রাকশন নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সড়ক নির্মাণ ছাড়া মাঝের আরেকটি অংশ একটি সেতু নির্মাণের কাজ পায় ভিন্ন একটি প্রতিষ্ঠান। এই সড়ক নির্মাণের কাজ বরেন্দ্র কনস্ট্রাকশন পেলেও কাজটি বাস্তবায়ন করছে মেসার্স হাসান এন্টারপ্রাইজ নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান। সড়কের কাজ শুরুর পর প্রথম দিকে খুব তোড়জোড় করে করা হলেও স্থানীয়দের দাবি গত দেড় বছর যাবত কাজটি বন্ধ রয়েছে। মাঝে শুধু দুটি কালভার্টের কাজ শুরু করা হয়। এরপর দীর্ঘদিন যাবত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজনকেও দেখা যায়নি। কাজ না করা হলেও ২০২৫ সালের নভেম্বরে সড়কের কাজের নকশা কিছুটা পরিবর্তন করে আরও এক কোটি ১২ লাখ টাকা বাড়িয়ে প্রাক্কলন ব্যয় ৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা করা হয়। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারী থেকে ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত দুই দফায় এই কাজের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু দুই দফা মেয়াদ বাড়িয়েও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি শেষ করতে পারেননি। তৃতীয় দফা মেয়াদ বাড়ানোর জন্যে আবেদন করা হয়েছে। অথচ দুই দফা মেয়াদ শেষ হলেও এই সড়ক নির্মাণ কাজ অর্ধেক বাস্তবায়ন হয়নি। কিন্তু কাগজে কলমে কাজের ৮৫ শতাংশ অগ্রগতি দেখিয়ে ৮ কোটি ৫ লাখ ৩৯ হাজার ৫১৭ টাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রদান করেছে এলজিইডি। দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকায় ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা। আর এলজিইডি দুইবার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দেওয়ার পরও পাত্তাই দিচ্ছে না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সর্বশেষ গত ১৩ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে মাদক, দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলা সভায় বাস্তবায়নকারি ঠিকাদার হাসান এন্টারপ্রাইজের বিরুদ্ধে সরকারের উন্নয়ন কাজের অনিয়ম ও ধীরগতির বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন একাধিক সংসদ সদস্য। সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের হুইপ আশরাফ উদ্দিন নিজান, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, বানিজ্য মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল সহ জেলার ৬ জন এমপি।
এদিকে, সড়কের কাজ যতটুকু করা হয়েছে তাও নিম্নমানের বলে অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাছাড়া সড়কের পাশে সিসি ব্লকের নিচে যে জিও ব্যবহার করা হয়েছে তা অত্যন্ত নিন্মমানের, যা ইতিমধ্যে পচে নষ্ট হয়ে গেছে। সড়কটি যথাসময়ে নির্মাণ না হওয়ায় দুশ্চিন্তা বাড়ছে কাশিনগর গ্রামের ঋষি পরিবার গুলোর। পশ্চিমে নদীর পানি আর পূর্বে বিলের পানির তোড়ে বাড়িঘর বিলীন হওয়ার শঙ্কা তাদের।

স্থানীয় বাসিন্দা হবিভূষণ ঋষি বলেন, ঠিকাদার প্রথম থেকেই দুই তিনশত ফুট করে সড়কের কাজ করেছেন। আমার কাশিনগর ঋষি পাড়ায় নিরীহ মানুষ পেয়ে সড়কের পাশের আমার জমি থেকেই জোরপূর্বক মাটি কেটে ফেলা হয়েছে। আমাদের জমি গুলো নষ্ট করে দিয়েছে। কাজ না করায় সড়কের এই মাটিও ভেঙে পড়ছে। গত দেড় দুইবছর এই সড়কের কাজ হচ্ছে না।

মঙ্গল ঋষি নামের আরেকজন বলেন, কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। কাশিনগর গ্রামের অংশে কাজই হয়নি। সম্পূর্ণ সড়কের কাজ ৫০ শতাংশের বেশি হয়নি বলে মনে করি।

বীরেন্দ্র ঋষি নামের একজন বলেন, দীর্ঘদিন যাবত এই সড়কের কাজ না করায় আমরা আশাহত হয়েছি। ভেবেছিলাম কাজটি করে আমাদের দুর্ভোগ কমাবে। কিন্তু ঠিকাদার গত দেড় বছর ধরে কাজ বন্ধ রেখেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা জেলা বিএনপির ধর্ম বিষয়ক সহ-সম্পাদক সন্তোষ ঋষি বলেন, গত দেড়বছর যাবত রাস্তার কাজ বন্ধ রয়েছে। আমরা দ্রুত চাই এই রাস্তাটি নির্মাণ করা হয়। আমরা যেন বিপদে না পড়ি, এমপি মহোদয় যেন বিষয়টি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে নির্দেশ দেন।

এই বিষয়ে জানতে বরেন্দ্র কনস্ট্রাকশনের পরিচালক মির্জা তৌহিদুল আলম (খোকন) এর মুঠোফোনে কল দেওয়া হলে, তিনি কাজ বাস্তবায়ন করা হাসান এন্টারপ্রাইজ থেকে বিস্তারিত জেনে জানাচ্ছেন বলে পরে ফোন দিতে বলেন। পরবর্তীতে একাদিক বার তাকে কল ও হোয়াটসঅ্যাপে ম্যাসেজ পাঠানো হলেও উত্তর পাওয়া যায়নি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল মান্নান জানান, এমএস খাল টু সিমনা সড়ক স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের চাহিদা দ্রুত বাস্তবায়ন করা। সরকারের উদ্দেশ্য জনগণের জন্যেই রাস্তাটি করা। যদি দেড়ি হয় তাহলে তো তারা সুফল পাচ্ছে না। তাই উপজেলা পরিষদ ও এলজিইডি জেলা অফিস থেকে একাধিকবার ঠিকাদারকে তাগিদপত্র দেওয়া হয়েছে কাজটি দ্রুত বাস্তবায়ন করার জন্যে। আমি যেহেতু ছিলাম না, খোঁজ নিয়ে দেখবো, আসলে কোন প্রক্রিয়ায় কিভাবে ঠিকাদারকে টাকা প্রদান করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, বাস্তবায়নকারি ঠিকাদার বেশ কিছু বড় বড় কাজ করছেন। রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিরা উনার কাজ নিয়ে উদ্বিগ্ন।

Facebook Comments Box

Posted ২:১৮ পিএম | শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

The Daily Sarod |