শিরোনাম
সরাইলে গরুর ঘাস কাটা নিয়ে টর্চলাইট জ্বালিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষ, আহত ১৫ মহা দশমি: বিদায়ের বেদনায় জাগুক অসাম্প্রদায়িক চেতনা সীমান্তবর্তী পূজামণ্ডপে বিজিবির বাড়তি নিরাপত্তা, তৎপর থাকবে প্রতিমা বিসর্জনেও সৌদিতে বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: খবর শুনে ফুফুর মৃত্যু, পরিবারে শোকের মাতম আন্তঃপ্রজন্ম সংহতির ধারাবাহিকতায় গড়ে উঠবে প্রবীণবান্ধব বাংলাদেশ প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়ার ঘোষণা ইশরাক হোসেনের দেশের ৪৭ দশমিক ৪২ শতাংশ পরিবার ঋণগ্রস্ত আখাউড়ায় ৬০০ পিস ইয়াবাসহ বিজিবির সিপাহী আটক দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় সৌদির রাষ্ট্রদূতকে তলব দুর্নীতির মামলায় সাবেক বিমানবাহিনী প্রধান কাতারে গ্রেপ্তার

মহা দশমি: বিদায়ের বেদনায় জাগুক অসাম্প্রদায়িক চেতনা

পীযূষ কান্তি আচার্য   প্রিন্ট
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬   সর্বশেষ আপডেট : 8:25 pm

মহা দশমি: বিদায়ের বেদনায় জাগুক অসাম্প্রদায়িক চেতনা

শারদীয় দুর্গোৎসবের শেষ দিন মহা দশমি। আনন্দ, উৎসব আর দেবী বন্দনার আবহ পেরিয়ে এই দিনটি নিয়ে আসে একদিকে বিদায়ের বেদনা, অন্যদিকে নতুন করে জীবনকে উপলব্ধি করার আহ্বান। মণ্ডপে মণ্ডপে যখন বিসর্জনের প্রস্তুতি চলে, তখন ভক্তদের হৃদয়ে বাজে বিদায়ের সুর। দেবী দুর্গাকে বিদায় জানাতে গিয়ে অনেকের চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। তবে মহা দশমি কেবল বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এর গভীরে রয়েছে অশুভ শক্তির বিনাশ, শুভ শক্তির জয় এবং মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার এক চিরন্তন বার্তা।

সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাসে দেবী দুর্গা শক্তি, সাহস, ন্যায় ও কল্যাণের প্রতীক। মহিষাসুরের বিরুদ্ধে দেবীর বিজয় অন্যায়, অত্যাচার, অহংকার ও অশুভ শক্তির পরাজয়ের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। এই বিজয়ের তাৎপর্য শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনেও এর গভীর প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। কারণ, মানুষের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে বৃহত্তর সামাজিক পরিসর—সবখানেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়, হিংসার বিরুদ্ধে শান্তি এবং বিভেদের বিরুদ্ধে সম্প্রীতির সংগ্রাম চলমান।
মহা দশমি আমাদের সেই সংগ্রামের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। দেবী দুর্গার শক্তি আরাধনার প্রকৃত সার্থকতা তখনই, যখন মানুষ নিজের ভেতরের হিংসা, লোভ, অহংকার ও বিদ্বেষকে পরাজিত করতে পারে। প্রতিমার সামনে প্রণাম জানানো যেমন ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রকাশ, তেমনি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং মানুষের অধিকার রক্ষায় ভূমিকা রাখাও মানবিকতার গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। ধর্মীয় উৎসবের শিক্ষা যদি আমাদের দৈনন্দিন আচরণে প্রতিফলিত না হয়, তবে তার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অনেকটাই অপূর্ণ থেকে যায়।
বাংলাদেশ বহুধর্ম, বহুভাষা ও বহুসংস্কৃতির দেশ। এ দেশের ইতিহাসে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের ঐতিহ্য গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। দুর্গাপূজা সেই সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল উপলক্ষ। পূজামণ্ডপে শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীরাই সমবেত হন না; বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষও উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেন। আলোকসজ্জা, ঢাকের বাদ্য, প্রতিমার শিল্পনৈপুণ্য ও সাংস্কৃতিক আয়োজন মিলিয়ে দুর্গোৎসব হয়ে ওঠে সর্বজনীন আনন্দের এক পরিসর।
এই সর্বজনীনতার চেতনাকে আরও শক্তিশালী করা আজকের সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। ধর্মীয় পরিচয় কখনো যেন মানুষের মধ্যে দূরত্ব, অবিশ্বাস কিংবা বৈরিতার কারণ না হয়। একজন মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো যেমন জরুরি, তেমনি অন্যের বিশ্বাস ও অধিকার রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সংখ্যাগরিষ্ঠ কিংবা সংখ্যালঘু—পরিচয় যা-ই হোক, প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনের অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। উৎসবের সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সারা বছর এই অধিকার ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার অঙ্গীকারও জরুরি।
মহা দশমির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ত্যাগ ও অনিত্যতার উপলব্ধি। কয়েক দিন ধরে যে প্রতিমাকে ঘিরে আনন্দ, আরাধনা ও আবেগের প্রকাশ ঘটে, দশমিতে সেই প্রতিমাই বিসর্জনের মধ্য দিয়ে ফিরে যায় প্রকৃতির কোলে। এই দৃশ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর কোনো আনন্দই চিরস্থায়ী নয়। কিন্তু আনন্দের স্মৃতি, ভালোবাসা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। প্রতিমা বিসর্জিত হয়, কিন্তু দেবীর শক্তি, সাহস ও কল্যাণের আদর্শ যেন মানুষের হৃদয় থেকে বিসর্জিত না হয়।
দুর্গোৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। প্রতিমা নির্মাণ থেকে শুরু করে মণ্ডপসজ্জা, আলপনা, লোকজ উপকরণের ব্যবহার এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশনা—সবকিছুতেই ফুটে ওঠে মানুষের সৃজনশীলতা। এ উৎসব শিল্পীদের শ্রম ও মেধাকে সম্মান জানানোরও উপলক্ষ। উৎসবের সৌন্দর্য তখনই পূর্ণতা পায়, যখন এর সঙ্গে যুক্ত মানুষের শ্রমের মর্যাদা, পরিবেশের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ নিশ্চিত হয়।
বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। কোথাও কোথাও সিঁদুর খেলার মধ্য দিয়ে বিবাহিত নারীরা দেবীকে বিদায় জানান, আবার ভক্তরা পরস্পরের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। বিজয়ার প্রণাম, কোলাকুলি ও মিষ্টিমুখের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে সৌহার্দ্য ও ভালোবাসার বন্ধন। এই বন্ধন যেন পূজার কয়েকটি দিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে। সমাজের প্রতিটি দিনেই যদি মানুষ পরস্পরের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিতে পারে, তবে উৎসবের প্রকৃত শিক্ষা বাস্তব জীবনে প্রতিষ্ঠা পাবে।
মহা দশমি তাই কেবল একটি ধর্মীয় উৎসবের সমাপ্তি নয়; এটি নতুন করে মানবিক সমাজ গড়ার প্রত্যয় গ্রহণের দিন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, দুর্বল মানুষের পাশে থাকা, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ প্রত্যাখ্যান করা এবং সব মানুষের জন্য মর্যাদাপূর্ণ সমাজ নির্মাণের অঙ্গীকারই হোক এ দিনের মূল শিক্ষা।
দেবী দুর্গার বিদায়ে মন ভারী হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই বেদনার মধ্যেই জেগে উঠুক নতুন আশার আলো। অশুভের বিনাশ ও শুভের প্রতিষ্ঠার যে চিরন্তন বাণী মহা দশমি বহন করে, তা আমাদের ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনে প্রতিফলিত হোক। ধর্ম যার যার, উৎসবের আনন্দ ও মানবিক মূল্যবোধ সবার—এই বিশ্বাস আরও দৃঢ় হোক। মহা দশমির বিদায়বেলায় এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা: বিভেদ নয়, সম্প্রীতি; বিদ্বেষ নয়, ভালোবাসা; অন্যায় নয়, ন্যায়ের জয়।

Facebook Comments Box

Posted ৮:২৫ পিএম | মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

The Daily Sarod |