সরাইলে ক্লিনিক-স্কুলের জায়গার বিরোধ, প্রধান শিক্ষকের দাবি ক্লিনিক ভেসে গেছে পানিতে

সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২০ | ৩:০৪ অপরাহ্ণ | 236 বার

সরাইলে ক্লিনিক-স্কুলের জায়গার বিরোধ, প্রধান শিক্ষকের দাবি ক্লিনিক ভেসে গেছে পানিতে

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার অরুয়াইল ইউনিয়নের দুবাজাইল কমিউনিটি ক্লিনিকের পুরাতন ভবন ভেঙে জায়গা দখল করে সেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন দোতলা ভবন নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। তবে সেই দাবি উড়িয়ে দিয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস বলছে, সেই জায়গা ভূমি রেকর্ডে স্বাস্থ্য বিভাগের নয়। স্কুলের জায়গায় অন্যকোনো প্রতিষ্ঠান নির্মাণের অনুমতি দেয়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব স্যারেরও এখতিয়ার নেই। এতে বিরোধ সৃষ্ট হওয়ায় স্থানীয়দের মাঝে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।


অভিযোগ উঠেছে, সেখানকার স্কুল পরিচালনা কমিটির লোকেরা কোটি টাকা বরাদ্দে তাদের দোতলা ভবন নির্মাণের সুবিধার্থে কমিউনিটি ক্লিনিকের পুরাতন ভবনটি ভেঙে ফেলে স্বাস্থ্য বিভাগের জায়গা জবরদখল নিয়েছে। অপরদিকে দুবাজাইল গ্রামের অধিকাংশ মানুষ সরকারের দেওয়া বরাদ্দে সেখানে স্বাস্থ্য বিভাগের জায়গায় কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এ নিয়ে সেখানে উত্তেজনা বিরাজ করছে।

স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, দুবাজাইল -অরুয়াইল গ্রামীণ সড়ক সংলগ্ন অরুয়াইল ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান হাজী ধন মিয়ার দুবাজাইল মৌজার সাবেক দাগ ৪০৪৪ ও ৪০৪৬ দাগে ৫ শতাংশ জমি বিগত ১৯৯৯ সালে ২৬ অক্টোবর ৪২৩৭ নং সাব কাবলা দলিলে স্বাস্থ্য ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে দানকৃত জমিতে গড়ে উঠে দুবাজাইল কমিউনিটি ক্লিনিক। যথাযথ ব্যবহারের অভাবে এবং বিভিন্ন সময়ে বর্ষার পানির ঢেউয়ে কমিউনিটি ক্লিনিক ভবনটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে। কিছুদিন আগে সেখানকার কমিউনিটি ক্লিনিকের জরাজীর্ণ ভবনটি ভেঙে সেই জায়গা দখলে নিয়ে দুবাজাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন দোতলা ভবন নির্মাণ শুরু করেন।

অভিযোগ আছে, স্কুলের পরিচালনা কমিটির সভাপতি নবী হোসেন এবং কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পংকজ ঘোষ কমিউনিটি ক্লিনিকটির পুরাতন ভবনটি ভাঙ্গিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের জায়গা দখল নিয়ে স্কুলের জায়গার সঙ্গে মিশিয়ে নেন। পরে এলজিইডি ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান স্কুলের দোতলা ভবন নির্মাণ শুরু করে। বর্তমানে সেই দোতলা ভবনের নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুবাজাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পংকজ ঘোষ বলেন, এখানে কমিউনিটি ক্লিনিকের কোনো অস্তিত্ব নেই। স্কুলের পাশেই কমিউনিটি ক্লিনিকের একটি পুরাতন জরাজীর্ণ ভবন ছিল, এটি বর্ষায় পানিতে ভেঙে ভেসে গেছে। স্কুলের জায়গাতেই নতুন দোতলা ভবন নির্মিত হচ্ছে। দুবাজাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি নবী হোসেন দাবি করেন, কমিউনিটি ক্লিনিক ভবনটি মাটির সঙ্গে মিশে ছিল। এখানে স্কুলের দোতলা ভবনের বরাদ্দ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কমিউনিটি ক্লিনিকের ভবনের ভাঙা অংশগুলোর উপরে মাটি ফেলে তা স্কুলের জায়গার সমান করা হয়েছে এবং সেখানে স্কুলের দোতলা ভবনের নির্মাণ কাজ চলছে। এখানে ভূমি অফিসের রেকর্ডে কমিউনিটি ক্লিনিকের জায়গা নেই।

দুবাজাইল এলাকার ইউপি সদস্য রেজাউল করিম বলেন, কয়েকদিন আগে স্কুল কমিটির লোকজন কমিউনিটি ক্লিনিকের পুরাতন জরাজীর্ণ ভবনটি ভেঙে স্বাস্থ্য বিভাগের জায়গা দখলে নিয়ে দোতলা ভবনের কাজ শুরু করেন। তখন তারা বলেছিলেন স্কুল প্রাঙ্গনের অন্যপ্রান্তে কমিউনিটি ক্লিনিকের ভবন স্থাপনে জায়গার ব্যবস্থা করে দেবেন। তখন এলজিইডি’র ইঞ্জিনিয়ার ও স্কুল ভবন নির্মাণের ঠিকাদারও উপস্থিত ছিলেন। তারাও বলেছে দুটিই সরকারি প্রতিষ্ঠান, এখানে স্বাস্থ্য বিভাগের জায়গাসহ নিয়ে স্কুল ভবনটি নির্মিত হলে বাস্তবায়ন কাজে সুবিধা হবে এবং দেখতেও সুন্দর লাগবে। বর্তমানে কমিউনিটি ক্লিনিক ভবন নির্মাণে বরাদ্দ এসেছে, ঠিকাদারও কাজ করতে এসেছেন, কিন্তু এখন স্কুল কমিটির লোকজন কমিউনিটি ক্লিনিকের জায়গা দিতে অপারগতা প্রকাশ করছে। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। এ নিয়ে সংঘর্ষ বাঁধলে খুন-মার্ডারও হতে পারে।


সরাইল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল আজিজ বলেন, সঠিক মাপজোক করা হলে দুবাজাইল সরকারি প্রাথমিক স্কুলের নবনির্মিত দোতলা ভবনটির এক-দুই ডিসিম (–শতাংশ) জায়গা  কমিউনিটি ক্লিনিকের জায়গায় পড়তে পারে। কিন্তু সেই জায়গা ভূমি রেকর্ডে স্বাস্থ্য বিভাগের নয়। উপজেলা চেয়ারম্যান স্যার কিভাবে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন জানিনা, স্কুলের জায়গায় অন্যকোনো প্রতিষ্ঠান নির্মাণের অনুমতি দেয়া আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব স্যারেরও এখতিয়ার নেই।

সরাইল এলজিইডি’র উপজেলা প্রকৌশলী নিলুফা ইয়াছমিন বলেন, দুবাজাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক কোটি টাকার বেশি বরাদ্দে দোতলা ভবন নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। স্বাস্থ্য বিভাগের জায়গায় ভবনটির কিছু অংশ পড়েছে বলে এখন লোকমুখে শুনতেছি। আমি এখানে যোগদানের আগে কিভাবে স্বাস্থ্য বিভাগের জায়গাসহ সেই ভবন নির্মাণ হচ্ছে তা আমার জানা নেই।

সরাইল উপজেলা পরিবার ও পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নোমান মিয়া সাংবাদিকদের জানান, দুবাজাইল এলাকায় সেই স্থানে বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণ করায় এখন কমিউনিটি ক্লিনিকের নতুন ভবন নির্মাণে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি সমাধানের জন্য উপজেলা চেয়ারম্যান মহোদয়ের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।

সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ এস এম মোসা বলেন, দুবাজাইল এলাকায় কমিউনিটি ক্লিনিকের কোনো জায়গা রেকর্ডে নেই। যিনি আগে স্কুলকে ৩৩ শতক জায়গা দান করেছিলেন, সেই ব্যক্তিই আবার পরে এই দাগের জায়গা থেকে ৫ শতাংশ জায়গা কমিউনিটি ক্লিনিককে দান করেছে। সেই জায়গা স্কুলের নামেই রেকর্ড হয়েছে। ইউএনও বলেন, স্কুলের জায়গায় কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের কোনো সুযোগ নেই।

সরাইল উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আলহাজ্ব রফিক উদ্দিন ঠাকুর বলেন, দুবাজাইল এলাকায় কমিউনিটি ক্লিনিক ও স্কুলের জায়গা নিয়ে গ্রামের মানুষ দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়ানোর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি জেনে গত বৃহস্পতিবার আমি দুবাজাইল এলাকায় গিয়ে স্কুলের দখলীয় জায়গা মাপজোক করে দেখতে পাই সেখানে ৪০ শতাংশ ৩৬ পয়েন্ট জায়গা আছে। অথচ স্কুল মাত্র ৩৩ শতাংশের মালিক। কমিউনিটি ক্লিনিকের জায়গাসহ অন্য বাকি জায়গা স্কুল জবরদখল করেছে, মাপজোকে তা প্রমাণ পাওয়া গেছে। যেহেতু সেখানে বিদ্যালয়ের বিশাল দৈর্ঘ্যের দোতলা ভবন নির্মাণ করে ফেলেছে, তাই বিদ্যালয়ের ওয়াশ ব্লক (শৌচাগার) এলাকায় যথেষ্ট খালি জায়গা রয়েছে এবং সেই জায়গায়ই কমিউনিটি ক্লিনিক ভবন নির্মাণের কথা বলেছি, এতে স্কুল কমিটির লোকজনও আমার সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন।

মন্তব্য করুন

Development by: webnewsdesign.com