সকল ক্ষেত্রে শান্তি প্রতিষ্ঠাই ছিল হযরত মোহাম্মদ (সঃ) এর মূল লক্ষ্য

রবিবার, ১০ নভেম্বর ২০১৯ | ৭:৪২ অপরাহ্ণ | 71 বার

সকল ক্ষেত্রে শান্তি প্রতিষ্ঠাই ছিল হযরত মোহাম্মদ (সঃ) এর মূল লক্ষ্য

১২ রবিউল আউয়াল, বিশ্ব নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম ও ওফাত দিবস। ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের এই দিনে সুবহে সাদেকের সময় মক্কা নগরীর সম্ভ্রান্ত কোরাইশ বংশে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের পূর্বেই তিনি পিতৃহারা হন এবং জন্মের অল্পকাল পরই বঞ্চিত হন মাতৃস্নেহ থেকে।

অনেক দুঃখ, কষ্ট ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে চাচা আবু তালিবের আশ্রয়ে বড় হয়ে ওঠেন। চল্লিশ বছর বয়সে উপনীত হওয়ার পর তিনি আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে নবুয়তের মহান দায়িত্ব লাভ করেন। নবুয়তের দায়িত্ব লাভ করে, অসভ্য বর্বর ও পথহারা জাতিকে সত্যের সন্ধান দিতে তিনি তাদের কাছে তুলে ধরেন আল্লাহর একত্ববাদের বাণী। আল্লাহর সাহায্যের ওপর ভরসা করে সমকালীন বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন বাজি রেখে সংগ্রাম চালিয়ে যান তিনি। ধীরে ধীরে সত্যান্বেষী মানুষ তার সঙ্গী হতে থাকে।
হজরত মুহাম্মদ (সা.) একাধারে একজন সংস্কারক, সফল রাষ্ট্রপ্রধান, প্রথম সংবিধান প্রণেতা শ্রেষ্ঠ মহামানব ও মানবতার মুক্তির জন্য আজীবন কঠোর সংগ্রামকারী রাসুল। তিনি সবার জন্য মহান আদর্শ। তার জীবনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল, সমাজের সর্বত্র শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। কাক্সিক্ষত লক্ষ্যপানে তিনি পুরোপুরি সফল।

তাই তো তিনি ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে বিশ্বশান্তির আদর্শ প্রতিষ্ঠা করে বিদায় হজে দ্বীন তথা জীবন ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গতার ঘোষণা দিয়ে যান। নবী করিম (সা.) ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন।
মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, সুশাসন কায়েম, মদিনাবাসীদের মধ্যে শান্তি-সহাবস্থান প্রভৃতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তিনি একটি সনদ প্রণয়ন করেন। যা ইতিহাসে ‘মদিনা সনদ’ নামে পরিচিত। এ সনদের মূলমন্ত্র ছিল ‘নিজে বাঁচো এবং অন্যকে বাঁচতে দাও। ’ ৪৭ ধারা বিশিষ্ট মদিনা সনদ বিশ্বের ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। মদিনা সনদের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ধারা হলো-

১. সনদে স্বাক্ষরকারী মুসলমান, ইহুদি ও খ্রিস্টান সবাই সমান অধিকার ভোগ করবেন।

২. নবগঠিত প্রজাতন্ত্রের সর্বাধিনায়ক হজরত মুহাম্মদ (সা.) এবং পদাধিকার বলে তিনি মদিনার সর্বোচ্চ বিচারপতি নিযুক্ত হবেন।

৩. মুসলমান এবং অন্য সবাই স্বাধীনভাবে যে যার ধর্ম পালন করতে পারবে। কেউ কারও ধর্মীয় ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।

৪. ইহুদিদের মিত্ররাও স্বাধীনতা ও পূর্ণ নিরাপত্তা ভোগ করবে।

৫. হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পূর্বসম্মতি ছাড়া মদিনাবাসী কারও বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারবে না। তবে ব্যক্তিগত শত্রুতার প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারবে।

৬. সনদে স্বাক্ষরকারী কোনো সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে তা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী মীমাংসা করা হবে।

৭. বহিঃশত্রু দ্বারা মদিনা আক্রান্ত হলে সনদে স্বাক্ষরকারী সব সম্প্রদায় বাধা প্রদান করবে।

৮. বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রতিহতকরণের যাবতীয় যুদ্ধ ব্যয় স্ব-স্ব সম্প্রদায় বহন করবে।

৯. মদিনা শহরকে পবিত্র শহর বলে ঘোষণা করা হলো। মদিনায় সব ধরনের রক্তপাত, হত্যা, অন্যায় ও অনাচার নিষিদ্ধ।

১০.সনদে স্বাক্ষরকারী সম্প্রদায়ের কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে তা তার ব্যক্তিগত অপরাধ বলে গণ্য করা হবে। এজন্য অপরাধীর সম্প্রদায়কে কোনো অবস্থাতেই দোষী সাব্যস্ত করা চলবে না।

ইতিহাস সাক্ষী, এই সনদের মাধ্যমে মদিনায় স্থিতিশীলতা ফিরে আসে, সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়, নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি গড়ে ওঠে। এ সনদের আলোকেই পৃথিবীতে সর্বপ্রথম আদর্শ ইসলামি সমাজ ও আন্তর্জাতিক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। মদিনার সনদ হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, কূটনৈতিক প্রজ্ঞা, ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, সমাজ সংস্কার, শান্তি, নিরাপত্তা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মহানবী (সা.)-এর নেতৃত্বে প্রতিনিয়ত যুদ্ধরত গোত্রের শহর মদিনা শান্তিপূর্ণ প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আরবের মুসলমান ও অমুসলমানদের মধ্যে আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি গড়ে তোলে। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক উইলিয়াম মুর বলেছেন, ‘মদিনার সনদে হজরতের অসাধারণ মহত্ত্ব ও অপূর্ব মননশীলতা শুধু তৎকালীন যুগে নয়, বরং সর্বযুগের, সর্বকালের মানুষের জন্য শ্রেষ্ঠত্বের পরিচায়ক। ’

এভাবে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) আরবের শতধাবিভক্ত বিবদমান অমুসলিম গোত্রগুলোকে সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা, ঐক্য স্থাপন ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করে তাদের জানমাল ও সম্মানের নিরাপত্তা বিধান করেন।

হজরত মুহাম্মদ (সা.) অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি অত্যন্ত সহনশীল ও পরধর্মসহিষ্ণু ছিলেন। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) যুদ্ধের তীব্রতার মাঝেও মুসলমানদের মানসিকতা সুস্পষ্ট করে দিয়ে বলেছেন, ‘শিশুদের হত্যা করবে না। গির্জায় যারা (খ্রিস্টান ধর্মযাজক) ধর্মীয় উপাসনায় জীবন উৎসর্গ করেছে, তাদের ক্ষতি করবে না, কখনো নারী ও বৃদ্ধদের হত্যা করবে না; কারও গাছপালা, ঘরবাড়ি কখনো ধ্বংস করবে না। ’ এভাবে ইসলাম শুধু মুসলমান নাগরিকদের জানমাল ও সম্মানের অধিকার প্রদান করেনি, বরং অন্যান্য ধর্মাবলম্বী নাগরিকের যথাযথ অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা বিধান করেছে। ইসলাম অমুসলিম নাগরিকদের নিজ নিজ উপাসনালয়সহ প্রভৃতির নিরাপত্তা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার অধিকার প্রদান করেছে।

ইসলামের সামাজিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য মুসলমানদের জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের প্রতি ভালোবাসা দেখানো উচিত। অমুসলিমদের সঙ্গে ন্যায়সংগত সদাচরণ, অভাবী ও নিরপরাধকে রক্ষা আর অনিষ্টের বিস্তার সাধনকে প্রতিহত করা দরকার। সব ধরনের অপকার মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা, আরাম ও শান্তি বিনষ্ট করে। আল্লাহ চান যারা তাকে বিশ্বাস করে তারা অবশ্যই ভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবে; একে অন্যকে কল্যাণের পথে সহযোগিতা করবে আর সর্বদা পাপকাজকে এড়িয়ে চলবে। মনে রাখতে হবে, ধর্মের কথা বলে অমুসলিমদের ওপর জুলুম করা চরম অপরাধ। এ প্রসঙ্গে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) মুসলমানদের সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘তোমাদের কেউ যদি কোনো অমুসলিমের প্রতি অন্যায় করে, তবে আমি কিয়ামতের দিন সেই মুসলমানের বিরুদ্ধে সাক্ষী হব। ’

এ ঘটনা তো সবারই জানা। মহানবী (সা.) একদিন মসজিদে নববীতে কিছু সঙ্গীকে নিয়ে আলোচনায় মশগুল ছিলেন। এমন সময় একজন বেদুইন এসে মসজিদের ভেতরে এককোণে প্রস্রাব করে দেয়। উপস্থিত সাহাবারা ঘটনাটি দেখে তাকে প্রহার করতে উদ্যত হলে নবী করিম (সা.) তাদের নিবৃত্ত করেন। প্রস্রাব করা শেষ হলে নবী মুহাম্মদ (সা.) তাকে বুঝিয়ে বলেন, ‘বাপু! এটা মুসলমানদের ইবাদতখানা, প্রস্রাবের স্থান নয়। ’ এ বলে তিনি তাকে বিদায় দিয়ে সাহাবিদের নিয়ে মসজিদের প্রস্রাব ধুয়ে দিলেন।

এভাবে নবী করিম (সা.) সারা বিশ্বে ইসলামের সাম্য মৈত্রী ও ন্যায়বিচারকেন্দ্রিক এক অনন্য সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। মানবসভ্যতা আজ উন্নতি অগ্রগতির উচ্চ চূড়ায় সমাসীন হলেও অনেক ক্ষেত্রে প্রাকসভ্যতা ও প্রাক-ইসলাম যুগের ববর্রতাই প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। নানান ছুতোয় দুর্বল জাতিসমূহের ওপর সবল জাতিসমূহের অত্যাচার-নির্যাতন পুরোদমে চলছে। মুখে মানবাধিকার, স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বড় বড় বুলি আওড়িয়ে মানবতা, ইনসাফ ও ন্যায়বিচারকে দুনিয়া থেকে নির্বাসন দেওয়া হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সব শ্রেণির মুসলমানের কর্তব্য হলো, মানবতাকে রক্ষায় এগিয়ে আসা এবং মহানবীর (সা.) আনীত জীবনব্যবস্থা ইসলাম ও ইসলামি মূল্যবোধকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রসার ও প্রতিষ্ঠার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করা। তবেই মিলবে শান্তি। আর এটাই হোক এবারের রবিউল আউয়াল মাসের দাবি।

মন্তব্য করুন

Development by: webnewsdesign.com