প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নের কী জবাব দেবে যুক্তরাষ্ট্র?

মঙ্গলবার, ০৭ মে ২০২৪ | ৯:৫৩ অপরাহ্ণ |

প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নের কী জবাব দেবে যুক্তরাষ্ট্র?
Spread the love

কিছু দিন আগের কথা। বাংলাদেশে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের সময় মার্কিন নাগরিকদের সতর্ক করেছিল ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস। সতর্কবার্তায় বলা হয়, ‘ভোটের দিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের সতর্ক থাকতে হবে এবং মনে রাখতে হবে যে শান্তিপূর্ণ হওয়ার কথা থাকলেও যেকোনো মুহূর্তেই পরিস্থিতি সাংঘর্ষিক ও সহিংস হয়ে উঠতে পারে।’

গত বছরের অক্টোবরেও বাংলাদেশ ভ্রমণে নাগরিকদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। সেসময় পররাষ্ট্র দপ্তর ২ মাত্রার এই সতর্কতা জারি করেছে। এই ভ্রমণ সতর্কতায় বলা হয়, অপরাধ, সন্ত্রাসবাদ এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ঘিরে বাংলাদেশ ভ্রমণে বাড়তি সতর্কতা জারি করা হয়। ওই বছরের ১১ জুলাই নিজ দেশের নাগরিকদের জন্য সতর্কতা জারি করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

webnewsdesign.com

‘পান থেকে চুন খসলেই’ বাংলাদেশে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের সতর্ক করে যুক্তরাষ্ট্র। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়েছে। সহিংসতার যে শঙ্কা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র, সেটি মিথ্যা প্রমাণ করেছেন বাংলাদেশের মানুষ। সহিংসতা হোক বা না হোক, বাংলাদেশকে বিব্রত করতেই মার্কিন নাগরিকদের সতর্ক করে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস। যদিও বাংলাদেশে মার্কিন নাগরিকদের ওপর হামলা ঘটনার খুব একটা নজির নেই। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে কি বাংলাদেশের নাগরিকরা নিরাপদে আছে?

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশিরা কতোটা নিরাপদে আছে, কয়েকটি ঘটনা জানলে তা পরিস্কার হয়ে যাবে। গত ২৭ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের বাফেলো শহরে দুই বাংলাদেশিকে গুলি করা হত্যা করা হয়। নিহতরা হলেন- সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার আবু সালেহ মো. ইউসুফ জনি (৫৩) এবং কুমিল্লার লাঙ্গলকোটের বাবুল মিয়া (৫০)। এর আগে ৭ এপ্রিল জাকির হোসেন খসরু নামের আরেক বাংলাদেশির ওপর হামলা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান ১০ এপ্রিল। গত ১২ এপ্রিল মিশিগান রাজ্যের ওয়ারেন সিটিতে নিজের বাড়িতে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান হোসেন আলী রাজি নামের এক তরুণ। গত ২৭ মার্চনিউইয়র্কে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ১৯ বছর বয়সি বাংলাদেশি তরুণ উইন রোজারিও।

গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর আমেরিকার টেক্সাস শহরে সন্ত্রাসীদের গুলিতে আবির হোসেন নামে এক বাংলাদেশি নিহত হন। ওই বছরের ২৯ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়া অঙ্গরাজ্যের ডারবির ৬৯তম স্ট্রিটের মসজিদ আল মদিনার পার্কিং লটে বাংলাদেশি মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমানকে (৬৫) গুলি করে হত্যা করা হয়। ২৩ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের ফিনিক্স শহরের কাছে কাসা গ্রান্দে এলাকায় গুলিতে প্রাণ হারান কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার কালিকাপুর গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ আবুল হাশিম। আর ১৯ জুলাই দেশটির মিজৌরি অঙ্গরাজ্যের সেন্টলুইস শহরের হ্যাম্পটন অ্যাভিনিউয়ে একটি গ্যাস স্টেশনে গুলি করে হত্যা করা হয় চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার বাসিন্দা রমিম উদ্দিন আহমেদকে। গত বছরের ৪ জানুয়ারি ক্যামব্রিজে বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত শিক্ষার্থী সাইদ আরিফ ফয়সালকে গুলি করে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ।

মানবাধিকার নিয়ে অন্যকে পরামর্শ দেওয়া যুক্তরাষ্ট্র নিজ ভূখণ্ডের মানুষের জীবনের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। প্রতিদিনই সেখানে কেউ না কেউ বন্দুক সহিংসতায় প্রাণ হারাচ্ছেন। ওয়াশিংটনভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা বন্দুক সহিংসতা সংরক্ষণাগারের (Gun Violence Archive) তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের শুরু থেকে জুলাই পর্যন্ত বন্দুক সহিংসতায় যুক্তরাষ্ট্রে ২৪ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হত্যার শিকার হয়েছেন ১০ হাজার ৭৮৭ জন আর বন্দুক ব্যবহার করে আত্মহত্যা করেছেন ১৩ হাজার ৫৯৬ জন। যার মধ্যে শূন্য থেকে১১ বছর বয়সি শিশু ১৬৩ জন, আর ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সি ৮৫৮ জন তরুণ কিশোর হত্যার শিকার হয়েছেন।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন গড়ে প্রায় ১ হাজার মানুষ। মার্কিন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘ম্যাপিং পুলিশ’ একটি প্রতিবেদনে দেখিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলির দ্বারা বেআইনিভাবে বল প্রয়োগের ক্ষেত্রে তদন্ত, বিচার এবং ক্ষতিপূরণ প্রদানের বাধ্যবাধকতা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কিন্তু ২০১৩ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত, পুলিশের দ্বারা সংঘটিত ৯৯ শতাংশ হত্যার জবাবদিহি করা হয়নি।

আমেরিকায় প্রতি মুহূর্তে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়। কিন্তু মানবাধিকার নিয়ে আমাদের শবক দেওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিছু বলেনা। তাদের চোখে শুধু আমাদের দেশের মানবাধিকারের প্রশ্ন। বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠন বা বুদ্ধিজীবীরা এনিয়ে খুব একটা প্রশ্ন তোলেন না। সবার মধ্যে একটা অজানা ভয় কাজ করে, যদি মার্কিন দূতাবাসের বিরাগভাজন হতে হয়, যদি মার্কিন ভিসা না পাওয়া যায়!

তবে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশিদের হত্যার বিচার এবং সেখানকার মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে সরব হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যুক্তরাষ্ট্রে ঘরে ঢুকে বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যার জবাব চেয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার (৩০ এপ্রিল) সন্ধ্যায় গণভবনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে ঘরে ঢুকে বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যা এর নিন্দা জানাই আমরা। মানবাধিকার সংস্থা এবং যারা আমাদের স্যাংশন দেয়, তারা এর কী জবাব দেবে? আমি এর জবাব চাই। যুক্তরাষ্ট্র নিজের চেহারা আয়নায় না দেখে। মানবাধিকার নিয়ে সবক দেয় বাংলাদেশকে। সে দেশের কোনো পুলিশের গায়ে কোনো রাজনৈতিক দল হাত তুললে, কী করত সেখানকার পুলিশ? ফিলিস্তিনে যুদ্ধের বিরোধিতা করায় সাধারণ মানুষের আন্দোলনে কি জুলুমটাই না করল যুক্তরাষ্ট্র পুলিশ। এটা তো মানবাধিকার লঙ্ঘন। এর জবাব কী?’

যুক্তরাষ্ট্রে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নির্দিষ্টভাবে কয়েকটি প্রশ্ন তুলেছেন। এক. ঘরে ঢুকে কেন বাংলাদেশিদের হত্যা করা হচ্ছে? দুই. মানবাধিকার সংস্থা এবং আমেরিকা এবিষয়ে চুপ কেন? তিন. যুক্তরাষ্ট্র পুলিশের ওপর কোনো রাজনৈতিক দল হামলা চালায়, তখন কি করে সেখানকার পুলিশ? চার. সাধারণ মানুষের ওপর যুক্তরাষ্ট্র পুলিশের জুলুম কি মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়?

আসলে বাংলাদেশ অনেক দিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের টার্গেটে রয়েছে। নানা আবদার পূরণ না করায় তারা এখানকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি ক্ষুব্ধ। মানবাধিকার দিবসে র‍্যাব এবং এলিট ফোর্সটির কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয় সেটা তারই অংশ।

বর্তমান সরকারকে নাস্তনাবুদ করতে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে ভয়ংকর খেলায় নামে যুক্তরাষ্ট্র। অথচ বিএনপি-জামায়াত ইস্যুতে বরাবরই নিরব থেকেছে তারা। চীন-রাশিয়া-ভারতসহ কয়েকটি দেশ বাংলাদেশের পাশে থাকায় খুব বেশি সুবিধা করতে পারেনি আমেরিকা। কিন্তু এখনও তারা থেমে নেই তাদের ষড়যন্ত্র। তাই সুযোগ পেলেই বাংলাদেশকে চেপে ধরার চেষ্টা করে।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।

মন্তব্য করুন

Development by: webnewsdesign.com