ধারণার ভিত্তিতে টিআই কর্তৃক দুর্নীতিগ্রস্ত বলা কতটা নৈতিক এবং যুক্তিসংগত?

রবিবার, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ১০:৫০ অপরাহ্ণ |

ধারণার ভিত্তিতে টিআই কর্তৃক দুর্নীতিগ্রস্ত বলা কতটা নৈতিক এবং যুক্তিসংগত?
Spread the love

গত ৩০ জানুয়ারি ২০২৪ তারিখে রাজধানীর ধানমন্ডিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর কার্যালয়ে জার্মানির বার্লিনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) এর সঙ্গে একযোগে দুর্নীতির ধারণাসূচক প্রতিবেদন ২০২৩ প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান হয়েছে ১০তম। ২০২২ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১২তম। টিআই তথ্যানুযায়ী, তালিকায় ১০০ স্কোরের মধ্যে সর্বোচ্চ স্কোর প্রাপ্তির ক্রমানুসারে ২৪ স্কোর পেয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৪৯তম। ২০২২ সালে ২৫ স্কোর পেয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪৭তম। অর্থাৎ প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বের দুর্নীতিগ্রস্থ দেশের তালিকায় বাংলাদেশের ২ ধাপ অবনমন হয়েছে। টিআইবি এর মতে, গত এক যুগের মধ্যে বাংলাদেশে দুর্নীতি এবার সবচেয়ে বেশি। আমি মনে করি, বাংলাদেশ যখন সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন সূচকে ক্রমান্বয়ে অগ্রসরমান সেসময় এধরনের প্রতিবেদন বাংলাদেশের অগ্রগতিকে অস্বীকার করার সামিল।

দুর্নীতির ধারণা সূচক (সিপিআই) এমন একটি সূচক যা “বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন এবং মতামত সমীক্ষা দ্বারা নির্ধারিত সরকারী ক্ষেত্রের দুর্নীতির ধারণা স্তর অনুসারে” দেশগুলিকে স্থান দেয় ৷ সিপিআই সাধারণত দুর্নীতিকে “ব্যক্তিগত লাভের জন্য অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার” হিসাবে সংজ্ঞায়িত করে। ১৯৯৫ সাল থেকে বেসরকারি সংস্থা টিআই দ্বারা প্রতি বছর এই সূচক প্রকাশ করা হয়। যদিও এটি দুর্নীতির ধারনা সূচক (সিপিআই) অর্থাৎ অনুমানের ভিত্তিতে এ সূচক প্রস্তুত করা হয় তথাপি বাংলাদেশে এর প্রতিবেদন প্রকাশের সময় বাংলাদেশকে সরাসরি বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ (১০তম) হিসেবে উল্লেখ করা হয়। শুধুমাত্র ধারণার ভিত্তিতে কোন দেশকে দুর্নীতিগ্রস্ত বলা কতটা যুক্তিসংগত? কতটা নৈতিক? সংস্থাটির প্রতিবেদন মতে, বিশ্বে আরও ৫১টি দেশ বা অঞ্চল রয়েছে যেখানে বাংলাদেশের চেয়ে বেশি দুর্নীতি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশকে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত (১০তম) বলা হচ্ছে।
পশ্চিমা সমর্থিত যেসকল দেশিয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থা ক্রমাগতভাবে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রাকে অস্বীকার করে আসছে টিআই তথা টিআইবি সেগুলোর অন্যতম। আমরা যদি টিআই প্রকাশিত বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকার দিকে তাকাই তাহলে দেখবো সেসকল দেশের নাম (যেমন, রাশিয়া-১৪১তম, ইরান-১৪৯তম, বাংলাদেশ-১৪৯তম, মায়ানমার-১৬২তম, আফগানিস্তান-১৬২তম, উত্তর কোরিয়া-১৭২তম, ইয়েমেন-১৭৬তম, সিরিয়া-১৭৭তম, ভেনিজুয়েলা-১৭৭তম, ইত্যাদি) যাদের সাথে পশ্চিমা দেশগুলোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রতিযোগিতা ও ক্ষেত্র বিশেষে দ্বন্দ্ব-সংঘাত রয়েছে। অর্থাৎ যেসকল দেশ পশ্চিমাদের কথামত চলে না সেগুলোকেই বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে প্রমাণ করতে তারা ব্যস্ত।
বাংলাদেশে সিপিআই শুরু হয় ২০০১ সালে। সেসময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি। বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ১ নম্বর দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে টিআই কর্তৃক চিহ্নিত হয়েছিল। ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৫ বছর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার দুর্নীতিকে কঠোর হস্তে নিয়ন্ত্রণ করায় সিপিআই এর প্রতিবেদনে উন্নতি ঘটায় সেসময় ১২তম থেকে ১৭তম এর মধ্যে উঠা-নামা করে। সুতরাং, সহজেই বলা যায় যে, বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি এর শাসনামলের তুলনায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ এর শাসনামলে দুর্নীতি অনেক কমেছে।
শেখ হাসিনার সরকারের গৃহীত যে সকল কর্মসূচি বাংলাদেশে দুর্নীতি কমাতে ভূমিকা রেখেছে সেগুলো হলো: দুর্নীতি দমন কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা, স্বচ্ছতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারি অফিসগুলোকে ডিজিটালাইজেশন করা, তথ্য অধিকার আইন ও কমিশন গঠন করা, সরকারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করা, ডিজিটাল কেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম প্রবর্তন করা, সচেতনতামূলক কর্মসূচি প্রসারিত করা, অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং ইউনিট প্রতিষ্ঠা করা, ইত্যাদি।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার বিগত ২০ বছরে দেশের অবকাঠামোগত ও আর্থ-সামাজিক ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন অথবা উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান রেখেছেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-পার্বত্য শান্তি চুক্তি, পদ্মা সেতু নির্মাণ, কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বঙ্গবন্ধু টানেল, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট মহাকাশে উৎক্ষেপণ, কক্সবাজারে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, কক্সবাজার সৈকতে আধুনিক বিমানবন্দর নির্মাণ, চট্টগ্রাম হতে পর্যটন নগরী কক্সবাজার পর্যন্ত রেল লাইন সম্প্রসারণ, যমুনা নদীর উপর দিয়ে রেল সেতু নির্মাণ, রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পদ্মা সেতু হয়ে দক্ষিণাঞ্চলে রেল লাইন সম্প্রসারণ, ঢাকায় মেট্রোরেল স্থাপন, বিমান বন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ, জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, অসংখ্য স্কুল-কলেজ রাষ্ট্রীয়করণ, দেশব্যাপী অসংখ্য ফ্লাইওভার ও এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ, গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত পাকা রাস্তা তৈরি, অসংখ্য ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণ ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন, সামাজিক সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন ধরনের ভাতা প্রদান, গৃহহীনদের জমিসহ ঘর প্রদান, নারী শিক্ষার্থীদের জন্য উপ-বৃত্তি প্রদান, প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ উল্লেখযোগ্য। অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সুচকে বাংলাদেশের সাফল্যের স্বীকৃতি দিয়েছে বিশ্ব সংস্থাগুলো। অথচ টিআইবির প্রতিবেদনে তার কোন প্রতিফলন নেই।
বিশ্বজুড়ে টিআই এর প্রতিবেদন নিয়ে অনেক নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। টিআই এর সমালোচকদের মতে, এদের রিপোর্ট সব সময় একটি রাজনৈতিক দল বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর পক্ষে যায়। বাংলাদেশ নিয়ে টিআই এর প্রতিবেদন দেখে মনে হয়, শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশের কোন উন্নয়নই হয়নি। সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্টের অ্যালেক্স কোভাম ২০১৩ সালে এক প্রতিবেদনে বলেছেন যে, টিআই এর অনেক কর্মী এবং অধ্যায় সিপিআই এর প্রকাশক ও সূচক সম্পর্কে উদ্বেগ নিয়ে “অভ্যন্তরীণভাবে প্রতিবাদ” করে। জোহান গ্রাফ ল্যাম্বসডর্ফ সূচকের মূল উদ্ভাবক হয়েও ২০০৯ সালে সূচকের কাজ থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন “১৯৯৫ সালে আমি দুর্নীতির ধারণা সূচক উদ্ভাবন করেছি এবং টিআই-কে আন্তর্জাতিক মনোযোগের স্পটলাইটে রেখে তখন থেকেই এটি সাজিয়েছি ৷ ২০০৯ সালের আগস্ট-এ আমি টিআই-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক কোবাস ডি সোয়ার্ডকে জানিয়েছি যে আমি আর দুর্নীতির ধারণা সূচক করার জন্য উপলব্ধ নই।”
গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, কোন দেশের উপর সিপিআই দ্বারা সংজ্ঞায়িত দুর্নীতির ধারণা সূচকের কারণে সেদেশের অর্থনীতির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সিপিআই কর্তৃক প্রকাশিত ২০০৭ এবং ২০০৮ সালের গবেষণাপত্রগুলি পরীক্ষা করে গবেষকরা বলেছেন যে, উচ্চতর সিপিআই এবং উচ্চতর দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে সম্পর্ক রয়েছে। একটি দেশের সিপিআই স্কোরের প্রতি ইউনিট বৃদ্ধির জন্য ১.৭% জিডিপি বৃদ্ধি পায় এবং দেশে বিদেশী বিনিয়োগের উচ্চ হারের সাথেও উচ্চতর সিপিআই স্কোরের ভূমিকা রয়েছে। ফলে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক বাংলাদেশের মত কোন দেশকে শুধুমাত্র ধারণার ভিত্তিতে দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে আখ্যা দেওয়া কতটা নৈতিক এবং যুক্তিসংগত? এ প্রশ্ন করাই যায়।

webnewsdesign.com

প্রফেসর ড. এম.এম. মাহবুব আলম
মৎস্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

 

মন্তব্য করুন

Development by: webnewsdesign.com