দুবাইয়ে লাখ টাকা বেতনের প্রলোভন, নিঃস্ব হওয়ার পথে নাসিরনগরের ৩০ পরিবার

শনিবার, ২৫ মে ২০২৪ | ১০:৪২ অপরাহ্ণ |

দুবাইয়ে লাখ টাকা বেতনের প্রলোভন, নিঃস্ব হওয়ার পথে নাসিরনগরের ৩০ পরিবার
Spread the love

দালালের খপ্পরে পড়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার কুন্ডা ইউনিয়নের তুল্লাপাড়া আদর্শ গুচ্ছ গ্রামের অন্তত ১২জন সংযুক্ত আরব আমিরাতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এ নিয়ে প্রতারণার শিকার পরিবারের স্বজনরা তাদের সন্তানদের ফিরে পেতে সরকারের সহযোগীতা চেয়েছেন। পরিবারগুলোর দাবি, টাকা চাইনা, আমাদের সন্তানদের সুস্থভাবে দেশে ফিরিয়ে আনা হোক।

অভিযোগ উঠে উপজেলার কুন্ডা ইউনিয়নের তুল্লাপাড়া গ্রামের আদর্শ গুচ্ছগ্রামের মোহাম্মদ আলীর ছেলে ইফরান ও তাঁর স্ত্রী পারুল বেগম ৩০ জনকে দুবাই নেওয়ার কথা বলে কোটি টাকা হাতিত

webnewsdesign.com

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৯৫ সালে সরকার ২১টি শর্তে গুচ্ছগ্রামের প্রতিটি পরিবারকে আট শতাংশ করে জায়গা বন্দোবস্ত দেয়। এখানে উপজেলার ৩০টি হতদরিদ্র পরিবার বসবাস করে আসছে। এর মধ্যে পারুল-ইরফান দম্পত্তির পিতা মোহাম্মদ আলীও ঘর পায় সেই গুচ্ছগ্রামে। কয়েক বছর পূর্বে ইরফান সংযুক্ত আরব আমিরাতে যায়। সেখানে গিয়ে জড়িয়ে পড়েন বাংলাদেশ থেকে মানুষ পাচারের কাজে। সেই সূত্র ধরে গত এক বছর ধরে গুচ্ছগ্রামের বেকার যুবকদের পরিবারকে টার্গেট করে ইরফানের স্ত্রী পারুল বিভিন্নভাবে সম্পর্ক গড়ে তুলেন। এর মধ্যে গুচ্ছগ্রামের কিছু পরিবারের নারীদের মা ডাকতে থাকেন। সেই সম্পর্কের জের ধরে অনেকের কাছেই পারুল ধর্ম মেয়ে হিসেবে পরিচিতি পায়। এর পর এই পারুল লাখ টাকা বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশ পাঠানোর কথা বলে স্থানীয় ৩০ জন যুবকের কাছ থেকে বিভিন্ন সময় টাকা নিয়েছে। এর মধ্যে ১২ জনকে বিদেশ পাঠানো হলেও অন্যরা অপেক্ষা আছেন কবে দুবাই যাবেন। এরই মধ্যে প্রবাসে থাকা যুবকদের সাথে প্রতারণা করা হয়েছে জানতে পেরেছেন দেশে থাকা অন্য যুবকরা। তারা দালালের বাড়িতে ভিড় করছেন। টাকা ফেরত চাইতে গিয়ে উল্টো হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

সরেজমিনে দালাল পারুল-ইরফান দম্পত্তির বাড়ি গিয়ে দেখা গেছে, বাড়ির ভেতরে মানুষের আনাগোনা। প্রতারণার শিকার বেশকিছু পরিবার অপেক্ষা করছেন তাদের স্বজনদের একটু খবর নেওয়ার জন্যে। কেউ আসছেন টাকা ফিরত নিতে। কিন্তু দেশে থাকা ইরফানের স্ত্রী পারুল ঘর থেকে বের হয়নি, দেখা দিচ্ছেন না তাদেরকে। এরই মাঝে তিনি সাংবাদিক আসার খবর পেয়ে বাড়িতে একটি ঘরে দরজা বন্ধ করে লুকিয়ে থাকেন। অনেক চেষ্টা করেও তার সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
এ সময় দেখা মেলে অভিযুক্ত ইরফানের বাবা মোহাম্মদ আলীর। তিনি তার ছেলে বিদেশ পাঠানোর কথা বলে টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, আমার ছেলে ও ছেলের বৌ নিয়েছে দেড় লাখ টাকা করে। পরে দুবাই যাওয়ার পর ডলারের মাধ্যমে নিয়েছে বাংলা টাকায় আরও দুই লাখ টাকা করে। কিন্তু আমার ছেলে যে লোকের কথায় সবার কাছ থেকে টাকা নিয়েছে সেই লোক প্রতারণা করছে। আমার ছেলের কাছ থেকে সব টাকা নিয়ে সেই লোক পালিয়ে গেছে বলে তিনি দাবি করেন।

ভুক্তভোগীদের পরিবার গুলোর অভিযোগ, প্রতারণা করে বিদেশ নিয়ে এখন সবার কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করছেন। টাকা দিলে দেশে পাঠানো হবে। আর টাকা না দিলে পাসপোর্ট দেওয়া হবে না। এরই মধ্যে প্রবাসে থাকা ১২ জনের পাসপোর্ট ছিনিয়ে নিয়ে গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এরমধ্যে আব্দুল কাইমু নামে এক অভিভাবক বলেন, ‘আমার ছেলেরে এক লাখ টেহা বেতন দিব কইয়া সাড়ে চার লাখ টেহা নিছে। কিন্তু দুবাই গিয়া অহন আমার ছেলে না খাইয়া মরনের দিকে যাইতাছে। আমি টেহা চাইনা। এহন । এহন আমার ছেলেরে দেশে ফিরাইয়া দেউক।’

মো. উল্লাস পাঠান নামে আরেকজন বলেন, ‘আমার ভাইসহ বেশ কয়েকজনরে দালাল ইরফান বেশি টাকা বেতনের কথা কইয়া বিদেশ নিছে। এহন সবাইরে একটা ছোট ঘরে তালা মাইরা পাসপোর্ট নিয়া পালাইছে। দুই সাপ্তাহ ধইয়া সবাই উপাস (ক্ষুধার্ত)। দালাল কইছে প্রতি জন যদি পাঁচ লাখ টাকা কইরা দেয় তাইলে সবার পাসপোর্ট ফিরত দিব এবং দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করব। আমরা জায়গা-জমি আর এনজিও থেইক্যা ঋণ নিয়া চার লাখ টাহা খরচ কইরা বিদেশ পাঠাইছি। এহন পাঁচ লাখ টাকা কই পামু।’

মুঠোফোনে কথা হয় প্রতারণরা শিকার দুবাই শহরের একটি ভবনের কক্ষে বন্ধী থাকা জয়নাল মিয়ার সাথে। তিনি জানান, আমরা গুচ্ছগ্রামের সরকারের দেওয়া ঘরে থাহি। সমিতি থিক্যা ঋণ আইন্যা আব্বা টাকা দিছে দালাল ইরফানরে। আমরা ১০-১২ দিন ধইরা কুছতা খাইনা। পেডের মধ্যে খিদার জ্বালা। আর বাড়িত ঋণের জ্বালা। এহন আমরা আত্মহত্যা করন ছাড়া আর কোন উপায় নাই।

স্থানীয় ইউপি সদস্য রশিদ মিয়া বলেন, পরিবারের স্বচ্ছলতা ফিরাতে মহাজনের চড়া সুদ, জমি বিক্রি ও এনজিও থেকে ঋণ করে প্রতারক ইরফানের হাতে টাকা তুলে দেয় এলাকার বেশ কিছু পরিবার। এখন আরো কিছু পরিবারের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার চেষ্ঠা করছে।

কুন্ডা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. নাছির মিয়া বলেন, বেশ কয়েকজন আমার কাছে অভিযোগ করেছেন। দুবাইয়ে লাখ টাকা বেতনের কথা বলে মোটা অংকের টাকা নিয়েছেন স্থানীয় ইরফান তার স্ত্রী পারুল মাধ্যমে। এখন যারা দুবাই গেছে তাদের কোন কাজ না দিয়ে পাসপোর্ট নিয়ে গেছে। আমরা দেখছি স্থানীয়ভাবে কোন সমাধান করা যায় কিনা।

নাসিরনগর থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোহাগ রানা বলেন, এই ঘটনায় থানায় কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ দিলে আমরা তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নিবো।

মন্তব্য করুন

Development by: webnewsdesign.com