আপডেট

x

চোখের জলে ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে বিদায় জানালেন ডিসি হায়াত উদ-দৌলা খান

বুধবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২২ | ১০:৪৭ অপরাহ্ণ | 136 বার

চোখের জলে ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে বিদায় জানালেন ডিসি হায়াত উদ-দৌলা খান
বিদায়ী জেলা প্রশাসক হায়াত উদ-দৌলা খান। ছবি: বাহাদুর আলম

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা থেকে বিদায় নিয়েছেন ডিসি হায়াত উদ-দৌলা খান। বুধবার (১৯ জানুয়ারি) দুপুরে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছেড়ে যান। তার বিদায়ে চোখ ভিজেছে সবার। অশ্রু সংবরণ করতে পারেননি তিনি নিজেও। জেলা প্রশাসক হায়াত-উদ-দৌলা খানের ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছেড়ে যাওয়ার মুহূর্তে তার বাংলোতে এমন এক আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়। চোখের জলে বিদায় জানান তাকে সহকর্মীরা ছাড়াও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।


তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসক হিসেবে গত সোয়া ৩ বছর কার্যকালে জেলার মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন। গণমানুষের প্রশাসক হিসেবেই পরিচিত হয়ে ওঠেন হায়াত উদ-দৌলা খান। নানান কাজের জন্য প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি। তিনি করোনা মোকাবিলায় ঝুঁকি নিয়েই ছুটে বেড়িয়েছেন বাইরে।

webnewsdesign.com

নিজেও করোনায় আক্রান্ত হন একাধিকবার। সর্বশেষ ইউপি নির্বাচনে দাঙ্গা-হাঙ্গামার জেলার চিরায়িত ঐতিহ্য মুছে দিতে তিনি সক্ষম হন। ইতিমধ্যে জেলার একশত ইউনিয়নের মধ্যে ৭৯ ইউনিয়নের নির্বাচন হয় একবারে শান্তিপূর্ণ।

২০১৮ সালের ৯ই অক্টোরব ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগদান করেন হায়াত-উদ-দৌলা খান। গত ৫জানুয়ারি তার বদলী আদেশ করা হয়। এরপর তিনি সর্বোচ্চ মেয়াদে এই জেলা প্রশাসক দায়িত্ব পালন করেন। বদলি আদেশের পর গত ১৩ই জানুয়ারি নতুন জেলা প্রশাসক মো. শাহগীর আলমের কাছে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন তিনি।

হায়াত-উদ-দৌলা খান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় যোগদান করার পরই মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্নগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন । যার অন্যতম সরাইল উপজেলার বিটঘর বধ্যভূমি। তার উদ্যোগে সেখানে শহীদদের নামফলক ও স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়েছে। ’৭১-এর ৩০শে অক্টোবর দুপুরে এ গ্রামে পাকবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখযুদ্ধ হয়। ওইদিন সন্ধ্যায় বিটঘর গ্রামের পার্শ্ববর্তী দুর্গাপুর গ্রামে পাকিস্তানি এক সেনাসদস্য গ্রামবাসীর বল্লমের আঘাতে নিহত হন। আর গ্রামবাসীর পিটুনিতে গুরুতর আহত হন উপজেলা সদরের মনু রাজাকার। এরপর ৩১শে অক্টোবর রাতে গ্রামের খালপাড়ের নির্জন এক জায়গায় ৮০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে ব্রাশফায়ার করে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল বর্বর পাকবাহিনী। স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরও অবহেলিত ছিল এই বধ্যভূমি। হায়াত-উদ-দৌলা খান সরজমিনে সেখানে যান এবং এটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন। তেমনিভাবে আখাউড়ার গঙ্গাসাগর, পৈরতলার বৈধ্যভূমি, ওয়াপদার টর্সারসেল সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন তিনি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সেন্দ গ্রামে ১৮ একর জায়গা নিয়ে ডিসি পার্ক প্রতিষ্ঠা তার অনন্য উদ্যোগ। এছাড়া জেলা শহরের দক্ষিণ মোড়াইলে পুরাতন ভূমি অফিসের স্থানে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জাদুঘর।


২০২১ সালে হেফাজতের তান্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে স্বল্প সময়ে সচল করার উদ্যোগ নেন জেলা প্রশাসক হায়াত-উদ-দৌলা খান। এছাড়া করোনা মহামারি মোকাবিলা, টিকা ব্যবস্থাপনা, ভূমি ও বাস্তুহারা মানুষদের ঘরের অধিকারী করার কাজেও সাফল্য দেখিয়েছেন। মুজিব বর্ষে গৃহহীন ও ভূমিহীনদের ঘর দেয়ার প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুত গৃহনির্মাণ কার্যক্রম এর আওতায় জেলায় ৬হাজার ৯৪ জনের তালিকা করার পর গত বছর ২হাজার ৩২ জনকে গৃহ হস্তান্তর করা হয়। আরও ২হাজার ৫৯ জনকে ঘর দেয়ার কার্যক্রমও শেষের পথে। ৬ হাজারের মধ্যে মোটামুটি একবছরে ৪হাজার ৯১ জনকে গৃহের অধিকারী করতে সক্ষম হয় তার নেতৃত্বে জেলা প্রশাসন।

২০২০ সালের পর ২০২১ সালে মহামারি মোকাবিলায় হায়াত-উদ-দৌলা খানের নেতৃত্বে কাজ করে জেলা প্রশাসন। করোনাকালে দেড় লাখ লোকের কাছে খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দেয়া হয়। ডেল্টা ভ্যারিয়েণ্ট আতঙ্কে গত এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমানা বন্ধ হলে চিকিৎসাসহ বিভিন্ন কারণে ভারতে গিয়ে আটকে পড়া ৪ হাজার ৪২৯ জন বাংলাদেশি নাগরিক আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে দেশে ফিরেন। তাদের প্রত্যেকের ২ সপ্তাহ করে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেণ্টিন নিশ্চিত করা, কোভিড টেস্ট করানো, আক্রান্ত হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং কোয়ারেন্টিন শেষে তাদেরকে স্ব-স্ব ঠিকানায় পাঠানোর মতো বিরাট কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন হয় হায়াত-উদ-দৌলা খানের নেতৃত্বে।

জেলার ইউপি নির্বাচন প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক হায়াত-উদ-দৌলা খান বলেন, ‘এটা করতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে আমাদের। সারা বাংলাদেশে যে নির্বাচনী সহিংসতা সেখানে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নামটা কোথাও নেই। সবাই এতে আশ্চর্য হয়েছে। সবাই মনে করেছিল এখানে আরও ভালো মতো হবে। সরাইল, নাসিরনগর, নবীনগর, বিজয়নগর, কোথাও না কোথাও মারামারি হবেই। এমন ধারনা ছিল সবার। ২০২১ সালের মার্চ মাসে হেফাজতের ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত অফিস, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে সংস্কার করে প্রাণ ফিরিয়ে দেয়ার কৃতিত্বও রয়েছে তার।

তিনি বলেন, ভূমি অফিস পুড়িয়ে দেয়ায় অনেকেই মনে করেছিল কবে কি হয় না হয়। এটি কিন্তু এখন ফাংশনাল।

বিদায়ী জেলা প্রশাসক হায়াত উদ-দৌলা খানের স্মৃতিচারণ করে তিতাস আবৃত্তি সংগঠনের পরিচালক মনির হোসেন বলেন, করোনা সংকটের মধ্যেও তিনি শিল্প-সংস্কৃতি এবং ক্রীড়াঙ্গনকে সক্রিয় রেখেছেন। তিনি গণমানুষের কাছাকাছি ছিলেন। তার বিদায় সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে আবেগের সৃষ্টি করেছে।

জেলা জামে মসজিদ কমটির সাধারণ সম্পাদক আশিকুল ইসলাম বলেন, তিনি যেকোনো কাজ আন্তরিকতার সঙ্গে করেছেন।

বিশিষ্ট নারী নেত্রী এডভোকেট তাসলিমা সুলতানা খানম নিশাত বলেন, তিনি ভিন্ন মাত্রার একজন জেলা প্রশাসক ছিলেন। সত্যিকার অর্থেই তার দরজা ছিল সবার জন্য খোলা। তার কর্মকান্ড সকল মহলে প্রশংসনীয় হয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাব সভাপতি রিয়াজ উদ্দিন জামি বলেন, সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করেই তিনি কাজ করেছেন।

জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আল মামুন সরকার বলেন, হায়াত-উদ-দৌলা খান যোগ্য এবং অভিজ্ঞ জেলা প্রশাসক ছিলেন। সকলের সঙ্গে সমন্বয় করেই কাজ করেছেন তিনি। তার সময়ে কোনো সমস্যা হয়নি।

সূত্র: মানবজমিন

মন্তব্য করুন

Development by: webnewsdesign.com