গরু-ছাগল কাণ্ডের কোরবানির ঈদ

বৃহস্পতিবার, ২৭ জুন ২০২৪ | ১২:২১ পূর্বাহ্ণ |

গরু-ছাগল কাণ্ডের কোরবানির ঈদ
Spread the love

এনবিআর কর্মকর্তা মতিউর ছেলের ৫২ লাখ টাকার পশু কোরবানি এখন টক অব দি কান্ট্রি। এমন অনেক বড় কর্মকর্তা,রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী আছেন যাদের স্ত্রী সন্তানরাও এমন কোরবানির উৎসবে ( বলা উচিত প্রতিযোগিতায়) মেতে উঠেছিলেন। লক্ষ লক্ষ টাকার একাধিক পশু তারা কোরবানি করেছেন। কেন করেছেন? ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হয়েই তো তারা এই কাজটি করেছেন। তাই না?

হয়তো তাদের মনের অজান্তে অনেক পাপ- পাশবিকতাও জমা হয়েছিল। তাই বনের পশুকে কুরবানী দেওয়ার মধ্য দিয়ে তারা চেয়েছিলেন নিজের মনের পশুকে কোরবানি দিয়ে শুদ্ধ হতে।কিংবা এতো কালা টাকা যদি কোরবানির নামে ব্যয় করা যায় তাতে নামও হবে সওয়াবও হবে,হবে মন শুদ্ধ। তারা কি শুদ্ধ হতে পেরেছেন? যদি পেরে থাকেন তাহলে তো খুবই ভালো। নিশ্চয়ই এরপর তারা আর কোন অন্যায় ও দুর্নীতিতে জড়িত হবেন না। কোরবানির শিক্ষা তো আসলে এমটাই।

webnewsdesign.com

কিন্তু পত্রিকার খবর বলছে ব্যতিক্রম বাদে সেই শিক্ষা আসলে কারোর হয় না। কোরবানির মাধ্যমে মনের পশু কোরবান করতে পেরেছে এমন সংখ্যা কয়জন আছে কে জানে — আছে কি? থাকলেও তা যে ১০/১২ টা পশু কোরবানি দেওয়ার মতো কেউ যে নয় তার উদাহরণ বে-নজীরের মতো নজির সৃষ্টিকারীরা। কেন পারেন না? কারণ বর্তমান বাস্তবতায় বড় বড় পদগুলোতে তারাই আসীন হন যারা তদবির তোষামোদিতে শ্রেষ্ঠ। একটা সময় ছিল যখন প্রকৃত মেধাবীরা,সৎ কর্মকর্তারা রাষ্ট্রের বড় পদগুলোতে আসীন হতেন। এখন যা কল্পনাও করা যায় না।

এ প্রসঙ্গে একটি গল্প মনে করে গেল– তিনি “ড. আকবর আলি খান। একসময় ছিলেন এনবিআর তথা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান। কোনো এক কোরবানির দিন বিকালে তিনি তখনকার অর্থমন্ত্রীর সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করার জন্য অর্থমন্ত্রীর বাসায় যাওয়ার সময় স্ত্রীকে বলে গেলেন –কোরবানি ঈদের সময় অনেক করদাতা ও কর কর্মকর্তা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের নেক নজরে আসার উদ্দেশ্যে বিকালে হয়তো গরুর রান কিংবা আস্ত খাসি বাসায় পাঠাতে পারে। খবরদার এগুলো কিন্তু তুমি গ্রহণ করবে না।

ঠিকই বিকেলে একটি মাইক্রোবাসে করে এক ভদ্রলোক বিরাট একটি গরুর রান নিয়ে আসেন, তিনি দাবি করেন
টি-রহমান সাহেব কোকো লঞ্চ কোম্পানির পক্ষ থেকে এ রান পাঠিয়েছেন। এটি যেন রাখা হয়। আকবর আলি খানের স্ত্রী নির্দেশ পাঠালেন, কোন অবস্থাতেই এটি রাখা হবে না। এটি যেন ফেরত নিয়ে যাওয়া হয়। বাহক বিড়বিড় করে হুমকি দিতে দিতে চলে যান। রাতে জনাব খান ফেরার পর স্ত্রী প্রশ্ন করেন কোকো লঞ্চ কোম্পানির টি রহমান কে? তার পাঠানো মাংস আমি ফেরত দিয়ে দিয়েছি। আমি বললাম টি রহমান মানে তারেক রহমান। তিনি প্রধানমন্ত্রীর জ্যেষ্ঠ পুত্র আমি তাকে আরো বললাম আমি নিজে বাসায় থাকলে এভাবে ফেরত দিতে আমার ভয় হত কিন্তু তুমি আমাকে এ ঝামেলা থেকে বাঁচিয়েছো।

এখানে দুটি প্রশ্ন — রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের স্ত্রী হয়েও প্রধানমন্ত্রীর ছেলের নাম জানেননি বা তাকে তিনি চেনেননি! এখনকার অনেক বড় কর্তারা শুধু ছেলে না,নাতি-নাতনীদের নাম শুধু নয়, জন্ম তারিখ পর্যন্ত মুখস্থ রাখে। কারণ কিন্তু একটাই – তোষামোদি! রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর ছেলেকে জানার বা চেনার প্রয়োজন তাদের হয়নি। তদবির তোষামোদি ছাড়া স্বীয় যোগ্যতায় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান হয়েছিলেন বলেই রানিং প্রধানমন্ত্রীর ছেলেকেও তাঁদের চেনার প্রয়োজন পড়েনি।” আজকের দিনের কথা একটু ভাবুন।

উদ্ধৃত অংশটুকু আছে ড. আকবর আলি খানের “পুরনো সেই দিনের কথা” বইয়ের ৮৩ পৃষ্ঠায়। একই বইয়ের ৮২ পৃষ্ঠায় আকবর আলী খান লিখেছেন- “সরকারি চাকরিতে অনেক প্রলোভন রয়েছে এই প্রলোভন থেকে আত্মরক্ষা করতে হলে অবশ্যই কর্মকর্তাকে ঘুষ ও অবৈধ উপার্জনকে মনেপ্রানে ঘৃণা করতে হয়। এই ক্ষেত্রে কর্মকর্তাকে সাহায্য করতে পারেন তার স্ত্রী ও তার পরিবার। যদি সরকারি কর্মকর্তার স্ত্রী ও পরিবার সহজ সরল জীবনযাত্রায় সন্তুষ্ট থাকেন এবং অবৈধ অর্থ কে ঘৃণা করেন তাহলেই সরকারি কর্মকর্তার পক্ষে সৎ থাকা অনেক সহজ হয়।

ভাবতে ভালো লাগে এদেশে এমন এনবিআরের চেয়ারম্যান একসময় ছিলেন। এখনো কেউ কেউ নিশ্চয়ই আছেন। দেশটা যে টিকে আছে এটিই তার প্রমাণ। এবার বাংলাদেশে মোট কুরবানীকৃত পশুর সংখ্যা প্রায় এক কোটি ৫ লক্ষ। আমি আমাদের পাড়াতেই যদি দেখি তবে এক-দুটি গরু ছাড়া বাকি সবগুলো গরু মহিষের দাম লক্ষাধিক টাকার ওপর। এছাড়া দুই লাখ, তিন লাখ,পাঁচ লাখ টাকার গরুও দেখেছি এই মফস্বল শহরে। এই জেলায়ও অন্তত এমন অনেক জন আছেন যারা এনবিআর কর্মকর্তার ছেলের মতো সাত আট এমনকি দশটি গরুও কোরবানি দিয়েছে।

যদি ধরে নিই প্রতিটি কোরবানিকৃত পশুর দাম গড়ে এক লক্ষ টাকা, তার মানে হচ্ছে কোরবানির পেছনে এবার দেশের খরচ হয়েছে কমপক্ষে এক লক্ষ পাঁচ হাজার কোটি টাকা। যা মোট বাজেটের ১৪% এবং শিক্ষা খাতে সারা বছরে যে ব্যয় হবে তার চাইতেও বেশি। এবছর আমাদের মোট বাজেটের পরিমাণ ৭ লক্ষ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতির পরিমাণ ২ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা। যে দেশ ওয়াজিব পালনের জন্য মোট বাজেটের ১৪% খরচ করতে পারে সেদেশকে অবশ্যই গরীব বলা সমীচীন হবে না। তবে বাস্তবতা হচ্ছে দেশের কমপক্ষে ৫০ ভাগ মানুষ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে ভীষণ কষ্টে আছে। এদিকে রাজস্ব বোর্ড রাজস্ব আদায় করার লক্ষ্যমাত্রায় কোনোবারই পৌঁছাতে পারে না। এবার বোর্ড কর্তাদের একটা বুদ্ধি দিই। যারা লক্ষাধিক টাকার গরু কোরবানি দিবে তাদের ভ্যাট ধার্য করা হোক ২০% এবং যারা একাধিক গরু কোরবানি দিবে তাদের ভ্যাট ধরা হোক ১০০%!

তাতে রাজস্ব আদায় যেমন বাড়বে তেমনি ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হওয়ার প্রতিযোগিতায় কারা কারা অবতীর্ণ তা পূর্বের বছরের তালিকা দেখে সহজেই বের করা যাবে। শুধু যে বের করা যাবে তা-ই না,অন্তত কোরবানির নামে অসুস্থ প্রতিযোগিতা আশা করছি বন্ধ হবে।

লেখক:
সহকারী অধ্যাপক (পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ)
কাজী মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম কলেজ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

মন্তব্য করুন

Development by: webnewsdesign.com