এত পরিচ্ছন্ন কেন সিঙ্গাপুর

রবিবার, ২৩ ডিসেম্বর ২০১৮ | ১২:০৮ অপরাহ্ণ | 476 বার

এত পরিচ্ছন্ন কেন  সিঙ্গাপুর

দেশটি আয়তনে বাংলাদেশের সবচেয়ে ছোট জেলা নারায়ণগঞ্জের চেয়েও ছোট। আর স্বাধীনতা অর্জনের বিচারে বাংলাদেশের মাত্র ৬ বছরের বড়। এদিকে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা যেখানে বিশ্বের অন্যতম দূষিত নগরী, সেখানে সিঙ্গাপুর এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন দেশ। পরিচ্ছন্নতা আর পরিকল্পিত সবুজায়নে দীর্ঘদিন ধরে এ মহাদেশে শীর্ষস্থান দখল করে রেখেছে নগররাষ্ট্রটি। তাদের এ সাফল্যের গল্প নিয়ে সম্প্রতি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি।

চেনা দৃশ্যপট-

উত্তর সিঙ্গাপুরের উপকণ্ঠ খাতিবের আবাসিক এলাকায় আবর্জনার খোঁজে ঘুরছেন ২০০ স্বেচ্ছাসেবক। তাদের মধ্যে কেউ কেউ এসেছেন শিশুসহ পুরো পরিবার নিয়ে। যোগ দিয়েছেন স্থানীয় হাসপাতালের কর্মীরাও। সবার পরনে একই রকম শার্ট। পথে যত ময়লা চোখে পড়ছে সব কুড়িয়ে নিচ্ছেন তারা।

এলাকাটি এমনিতেই বেশ পরিচ্ছন্ন। তাই সেখানে এ ধরনের তৎপরতা অনেকের কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হতে পারে। কিন্তু সিঙ্গাপুরে এমনটাই প্রত্যাশিত। কারণ পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর দেশে পরিণত হওয়ার মূলে রয়েছে জনসচেতনতা।

দেশটির রাজধানী সিঙ্গাপুর সিটির যে কোনো রাস্তা ধরে সোজা হেঁটে গেলে অবশ্যই ময়লার ট্রাক চোখে পড়বে, যেটি ওইদিনের বর্জ্য সংগ্রহের জন্য অপেক্ষমাণ। তাই বুঝতে সময় লাগার কথা নয়, কেন শহরটি এত পরিষ্কার।

180997.jpg

পরিবেশ সুরক্ষায় যুদ্ধ-

দেশটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউয়ের শুরু করা ‘কিপ সিঙ্গাপুর ক্লিন’প্রচারাভিযানের ৫০ বছর পূর্ণ হয়েছে এই অক্টোবরে। এজন্য চলতি বছর সিঙ্গাপুরে পরিচ্ছন্নতা অভিযানের অন্যরকম তাৎপর্য রয়েছে। স্বাধীনতা লাভের তিন বছর পর ১৯৬৮ সালে প্রথমবারের মতো যত্রতত্র আবর্জনা ফেলার দায়ে সরকার জরিমানার বিধান চালু করে, যার দীর্ঘমেয়াদি ফল আজকের পরিচ্ছন্ন সিঙ্গাপুর।

ময়লার জন্য জরিমানার পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা ও সবুজায়নের লক্ষ্যে দেশটির সরকার ধারাবাহিক উদ্যোগ নেয়। ১৯৭১ সালে চালু করা হয় বার্ষিক বৃক্ষরোপণ দিবস। এর দু’বছর পর শুরু হয় পানি বিশুদ্ধ রাখার প্রচারাভিযান। এরপর ১৯৭৬ সালে চলে অন্যরকম প্রচার ‘আপনার হাত ব্যবহার করুন’ এর আওতায় সাপ্তাহিক ছুটির দিনে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের পাশাপাশি সরকারি কর্মচারীরাও স্কুল পরিষ্কারে অংশ নেন। পরের বছর নেওয়া হয় নদী পরিষ্কারের উদ্যোগ। বর্তমানে সিঙ্গাপুরের নদীর পানি এতই স্বচ্ছ যে, তা পানীয় জল হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।

১৯৮৩ সালে টয়লেট পরিষ্কারে জনসচেতনতার উদ্দেশ্যে চালানো হয় ব্যাপক প্রচার। আর ১৯৯২ সালে চুইংগাম আমদানি ও বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়। এর মাঝে বিভিন্ন সময়ে নেওয়া হয়বৃক্ষায়নের উদ্যোগ।

পরিচ্ছন্নতার সুদূর লক্ষ্য শক্তিশালী অর্থনীতি-

লি কুয়ান সদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়েই পরিচ্ছন্নতা ও সবুজায়ন নীতি ঘোষণা করেন। এর মধ্যে ছিল জনস্বাস্থ্য আইন পরিবর্তন, হকারদের নির্দিষ্ট জায়গায় পুনর্বাসন, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং রোগ প্রতিরোগে ব্যবস্থা গ্রহণ। ১৯৬৮ সালে সিঙ্গাপুর সিটিতে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘প্রশান্তির শহর গড়াই আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। প্রকৃতপক্ষে একটি পরিচ্ছন্ন নগরই গড়বে শক্তিশালী অর্থনীতি।’

সিঙ্গাপুর সেসব লক্ষ্য সফলভাবেই পূরণ করেছে। দেশটির প্রত্যাশিত গড় আয়ু ৬৬ থেকে বেড়ে এখন ৮৩ বছর। ১৯৬৭ সালে পর্যটকের সংখ্যা ছিল দুই লাখ। এ বছরের প্রথম নয়মাসেই সে সংখ্যা এক কোটি ছাড়িয়ে গেছে। গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) যেখানে মাত্র ৯ কোটি মার্কিন ডলার ছিল, ২০১০ সালেই তা ৩৯০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যায়। এফডিআই গ্রহণের দিক থেকে সিঙ্গাপুর এখন বিশ্বে পঞ্চম।

পরিচ্ছন্নতার জন্য দেশটি পর্যটকদের বিশেষ পছন্দ। পরিচ্ছন্ন সড়ক বিদেশি বিনিয়োগকারীদের এ বার্তা দেয় যে, দেশটি সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সক্ষম।

সিঙ্গাপুর সিটি : জরিমানার নগরী-

দেশটির শপিং সেন্টারগুলোতে বিক্রি হওয়া টি-শার্টে একটি কথা প্রায়ই মুদ্রিত থাকে ‘সিঙ্গাপুর : জরিমানার নগরী’। দক্ষিণ এশিয়ার ছোট্ দেশটিতে রয়েছে বিচিত্র নানা আইন। একটু বেখেয়াল হলেই দিতে হয় জরিমানা। বিদেশিদেরও এগুলো মেনে চলতে হয়। চুইংগাম তো নিষিদ্ধই। ট্রেনে ডুরিয়ান (কটুগন্ধের ফল) বহন কিংবা টয়লেট ফ্লাশ না করলে গুণতে হয় জরিমানা। রাস্তায় থুথু কিংবা অনুমতি ছাড়া ওয়াইফাই ব্যবহার করলেও ছাড় নেই। ই-সিগারেটের ওপরও রয়েছে নিষেধাজ্ঞা।

দৃষ্টিকটু যে কোনো কিছু জরিমানাসহ নিষিদ্ধ করা সিঙ্গাপুরের একটি রীতি। ১৯৬৮ সালে চালু হওয়া অর্থদণ্ডের সঙ্গে দেশবাসী ইতিবাচকভাবেই অভ্যস্ত। যেখানে সেখানে ময়লা ফেলার দায়ে এখনও গড়ে বছরে ১০ হাজার জন জরিমানার কবলে পড়েন। এজন্যে একজনকে গুণতে হয় কমপক্ষে ২১৭ ডলার।

এ পরিবর্তনের সূচনা লি কুয়ানের সময় থেকে। কোনো অনিয়ম দেখলেই তিনি সরাসরি মন্ত্রী বা আমলাদের চিঠি পাঠাতেন। সাবেক এ প্রধানমন্ত্রী মনে করেন, কোনো ক্রটিই মামুলি নয়। প্রশাসনিক সামান্য দুর্বলতা থেকেই মানুষ আইন অমান্যের সুযোগ নেয়।

malaysia-thailand-singapore-banner-lumbini-travels-1
পরিচ্ছন্নতার পথে চ্যালেঞ্জ-

রাজধানীর উত্তরের শহর নি সুনের সংসদ সদস্য লি বি। পরিচ্ছন্নতা নিয়ে বিশেষ উৎসাহী এ জনপ্রতিনিধি তার এলাকায় মাসে কমপক্ষে একটি প্রচারাভিযানে অংশ নেন। তিনি মনে করেন, জরিমানার পাশাপাশি জনসচেতনতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সবসময় শাস্তি দেওয়া সম্ভব হয় না, কারণ এক্ষেত্রে কমপক্ষে একজন কর্মকর্তা বা নাগরিকের সাক্ষ্য প্রয়োজন হয়। সবার আগে প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন।

সিঙ্গাপুরের জাতীয় পরিবেশ সংস্থার চেয়ারম্যান লিয়াক টেং লিট বলেন, বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সংখ্যা ৫৬ হাজার। এছাড়া আছে কয়েক হাজার অনিবন্ধিত ঠিকাদার। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে এ খাতে ব্যয় বেড়ে চলছে। উন্মুক্ত এলাকা পরিচ্ছন্ন রাখতে বর্তমানে বার্ষিক ব্যয় ৯ কোটি ডলারের বেশি। তার ভাষ্য, মানুষ নিজ থেকে সচেতন হলে পরিচ্ছন্নতায় এত ব্যয় হবে না। সে অর্থ স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে লাগানো যাবে।

মন্তব্য করুন

Development by: webnewsdesign.com