আপডেট

x

আব্দুল মোনেম: একজন কর্মবীরের মহাপ্রয়াণ

রবিবার, ৩১ মে ২০২০ | ১১:১৮ অপরাহ্ণ | 291 বার

আব্দুল মোনেম: একজন কর্মবীরের মহাপ্রয়াণ

ধানের গোলা ফুরিয়ে এসেছে। সালু মিয়া সেই গোলায় লুকিয়ে আছে। নতুন ভাবি পর্দানশীল। নতুন ভাবিকে দেখার জন্য স্বামীর বন্ধুর এই অভিনব পন্থা। বলছি আমার নানা হাবিবুর রহমান মাস্টারের বন্ধু সালু মিয়া ওরফে আব্দুল মোনেম এর কথা।


জন্মের পর বাবা মারা গেছেন। মা তাঁকে আগলে রেখে বড় করেছেন। আব্দুল মোনেম তাঁর বাবার ভিটে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিজেশ্বর আর মামার বাড়ি আখাউড়া উপজেলার হীরাপুরে ছাত্রজীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন।

মেট্রিকুলেশন পাশ করে আমার নানা আর আব্দুল মোনেম একই সঙ্গে উত্তর বঙ্গে একটি সড়ক নির্মাণ কোম্পানিতে সুপারভাইজার হিসেবে যোগ দেন। নানা পরিশ্রম করতে ব্যর্থ হোন। বন্ধুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফিরে আসেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া। যোগ দেন সরকারি প্রাইমারি স্কুলে। প্রধান শিক্ষক হিসেবে অবসর নেবার পর আব্দুল মোনেম তাকে বলেন- তুমি আমার স্কুলের দায়িত্ব নাও৷ নানা বয়সের জন্য অপারগতা জানালে তাকে ‘বিদ্যোৎসাহি’ পদ দিয়ে এ মোনেম স্কুল ও কলেজের উপদেষ্টা নিয়োগ করেন। আমৃত্যু সেটা নিয়েই ছিলেন নানা।

আব্দুল মোনেমের কাছে গিয়ে কেউ কখনো খালি হাতে ফেরেনি। চাকরি, টাকা যাকে যেটা দেবার, দিয়েছেন। সব সময় আলেম উলামাদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রাখতেন। তাদের থেকে ধর্মীয় পরামর্শ নিতেন। তাঁর প্রধান কার্যালয়ে পাঞ্জেগানা মসজিদ ছিলো বাধ্যতামূলক। ধার্মীক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেশি আদর করতেন।

তিনি যে এলাকায় কন্সট্রাকশনের কাজে হাত দিয়েছেন সেখানেই মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা করে দিয়ে এসেছেন। ওসব এলাকায় ছড়িয়ে পড়তো দানবীর আব্দুল মোনেমের গল্প। তিনি সাইট ভিজিটে গেলে গ্রামবাসী জড়ো হতেন। দু’হাত ভরে অচেনা মানুষকে দান করে আসতেন।

সময় পেলে বিজেশ্বর গ্রামের আনাচে কানাচে তার বাল্য বন্ধুদের খোঁজ নিতে যেতেন। স্মৃতিচারণ করতেন তাঁর বাল্য কালের। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কাউকে পেলে কথা বলতেন আঞ্চলিক ভাষায়।


এতো বড় একজন শিল্প উদ্যোক্তা, অথচ তাঁর মনে কোন অহমিকা ছিলো না৷ আচরণ ছিলো সাবলীল। অবলীলায় নিজের শুণ্য থেকে শুরু করার গল্প করতেন৷

একজন আব্দুল মোনেম হাজার বছরে একবার জন্মে। মেধা, মননে, মানবিকতায় অনন্য এক মানুষ ছিলেন তিনি।

১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত আব্দুল মোনেম লিমিটেডের ব্যবসা আমৃত্য পরিচালনা করে গেছেন তিনি। তার পুত্রদ্বয় এ এস এম মাইনুদ্দিন মোনেম এবং এ এস এম মহিউদ্দিন মোনেম উভয়ই প্রতিষ্ঠানটির উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

গত ৬৪ বছরে বাংলাদেশ সরকার, বিশ্ব ব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এবং ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার সঙ্গে মিলে বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়নমূলক প্রকল্প সম্পন্ন করেছে।

কোকা-কোলার বোতলজাতকরণ, চিনিকল, ওষুধ, ইগলু আইসক্রিম, ইগলু ফ্রোজেন ফুড, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার তৈরি করছে আব্দুল মোনেম লিমিটেড। বর্তমানে আব্দুল মোনেম লিমিটেডে ১০ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করছেন।

তিনি ও তাঁর পুত্রদ্বয় এবং কনিষ্ঠ তনয়া ডা. ফারহানা মোনেম একই পরিবারে এই চারজনই সিআইপি। এবং স্ব স্ব ক্যাটাগরিতে সর্বোচ্চ করদাতা।

২০১৬ সালে বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে শিল্প স্থাপন, পণ্য উৎপাদন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জাতীয় আয় বৃদ্ধি ও অর্থনীতিতে অবদানের জন্য রাষ্ট্রপতি পদক পেয়েছেন দানবীর আবদুল মোনেম।

তাঁর পিতৃকুল এবং মাতৃকুলের পুরো গ্রামের চেহারা পাল্টে গেছে এই পরশমণির ছোঁয়ায়। ৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৭ এ জন্মানো কর্মবীরের আজ মহাপ্রয়াণ হলো। তিনি বেঁচে থাকবেন তার লাখো কর্মীর মনে। একজন আব্দুল মোনেমের উসিলা লাখো কর্মীর মুখে আহার জুটছে। তাদের এবং তাদের পরিবারের পাঁঁচবেলা ইবাদতের পর তাঁকে মনে করে দু-ফোঁটা চোখের জল ঝরবেই।

লেখক-
অনলাইন এক্টিভিস্ট

মন্তব্য করুন

Development by: webnewsdesign.com