অমিতকে নিয়ে ঢাকার ‘অস্বস্তি’ কি দূর করতে পারবেন জয়শঙ্কর?

রবিবার, ০২ জুন ২০১৯ | ৯:১২ পিএম | 275 বার

অমিতকে নিয়ে ঢাকার ‘অস্বস্তি’ কি দূর করতে পারবেন জয়শঙ্কর?

দুজনেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রিয়পাত্র, আস্থাভাজন। একজন প্রায় তিন দশক ধরে রাজনৈতিক ডান হাত। অন্যজনের সঙ্গে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা দশক পুরনো; কর্মজীবনে অনেক আমলাকে টপকে তাকে বসিয়েছিলেন শীর্ষ পদে।
প্রথমজন অমিত অনিলচন্দ্র শাহ— ভারতের নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিজেপির সভাপতি। দ্বিতীয়জন সুব্রহ্মণ্যম জয়শঙ্কর— দুঁদে কূটনীতিবিদ ও বিদেশনীতির বিশেষজ্ঞ; এখন তার নতুন পরিচয় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
নরেন্দ্র মোদির দ্বিতীয় মেয়াদের মন্ত্রিসভায় এই দুজনের যোগদানকে কীভাবে দেখছে বাংলাদেশ?
বিশ্লেষকরা মনে করেন, অমিত শাহকে নিয়ে ঢাকার অস্বস্তিবোধের কিছু কারণ আছে বৈকি। অন্যদিকে জয়শঙ্করের ব্যাপারে খুশি হওয়াটা স্বাভাবিক বলেই ধরে নেওয়া চলে।
মোদির প্রথম মেয়াদে যে তিন বছর জয়শঙ্কর ভারতের পররাষ্ট্রসচিব ছিলেন, প্রতিবেশী বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে তার অবদান ছিল অসামান্য। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক, প্রত্যেকের সঙ্গে তিনি হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন।
আর তিন বছরের মেয়াদে জয়শঙ্কর এত বার ঢাকা সফর করেছেন, তা রেকর্ড হয়ে আছে; ভারতের দ্বিতীয় কোনও পররাষ্ট্র সচিবের তা নেই। মোদির বিদেশনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ যে ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ (সবার আগে প্রতিবেশী) তার মূল স্থপতিই ছিলেন জয়শঙ্কর। বলাই বাহুল্য, বাংলাদেশ ছিল সেই নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে।
ফলে অসুস্থতার কারণে ভারতের মন্ত্রিসভা থেকে সুষমা স্বরাজের বিদায়ের পর জয়শঙ্করকে নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়ায় বাংলাদেশের খুশি হওয়ারই কথা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তার নিয়োগের পর গত ২৪ ঘণ্টায় বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মহলের যে কথাবার্তা হয়েছে তাতেও সেই ইতিবাচক সুরই ঝরে পড়েছে। বিশ্লেষকরাও একই কথার প্রতিধ্বনি করছেন। কিন্তু ভারতের নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্পর্কে একই কথা বলা যাচ্ছে না।
এবার নির্বাচনি প্রচারণায় ভারতের যে রাজনীতিবিদ সবচেয়ে চড়া গলায় বাংলাদেশ প্রশ্নে আক্রমণ শানিয়েছেন, তিনি অমিত শাহ। বিভিন্ন জনসভায় তিনি হুমকি দিয়েছেন, ভারত থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের খুঁজে বের করে দেশ থেকে তাড়ানো হবে। আর এখানে কোনও ‘ডিপ্লোম্যাটিক কারেক্টনেস’-এর ধারও ধারেননি তিনি। সোজাসুজি বলেছেন, অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বলতে তিনি বাংলাদেশিদেরই বোঝাচ্ছেন।
ভারতে বসবাসকারী কথিত অবৈধ বাংলাদেশিদের তিনি কী চোখে দেখেন, সেটাও স্পষ্ট হয়ে গেছে তার ‘উইপোকা’ (টারমাইটস) সম্বোধনে। বোঝাতে চেয়েছেন, ভারতের অর্থনীতিতে ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধায় ঘূণ ধরাচ্ছে এরা।
এতেই শেষ নয়, আসামের বিতর্কিত যে জাতীয় নাগরিকপঞ্জির (এনআরসি) জেরে রাজ্যের লাখ লাখ বাঙালি মুসলমানের রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, সেই একই প্রক্রিয়া পশ্চিমবঙ্গসহ দেশের আরও নানা রাজ্যে চালু হবে বলেও তিনি ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন। এই ‘রাষ্ট্রহীন’দের বাংলাদেশে ডিপোর্ট করাই বিজেপির ঘোষিত অবস্থান, এবং দলের সভাপতি এই হঁশিয়ারিও দিয়ে রেখেছেন, ‘মিলিয়ে নেবেন, অমিত শাহ যা বলে তা-ই করে!’
এমন ব্যক্তি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে থাকা এক জিনিস, আর যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান, সেটা অন্য জিনিস। ফলে নরেন্দ্র মোদি ও শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত কেমিস্ট্রি যতই ভালো হোক, এই নিয়োগে অন্তত বাংলাদেশের স্বস্তি পাওয়ার কোনও কারণ নেই বলেই মনে করেন বিশ্লেষকরা।
এস জয়শঙ্কর
ভারতের কোন রাজ্যে কীভাবে অবৈধ বিদেশিদের শনাক্ত করার কাজ শুরু হবে, কারা কীভাবে নাগরিকত্ব খোয়ানোর হুমকিতে পড়বেন— এসবই দেখাশুনো করবে অমিত শাহের মন্ত্রণালয়। তার দফতর থেকেই স্থির হবে, এদেশে বসবাসকারী রোহিঙ্গারা— যাদের ভারত নিরাপত্তার হুমকি বলে মনে করছে এবং শরণার্থী বলেও স্বীকার করছে না— তাদের তালিকাই বা কবে কীভাবে প্রস্তুত হবে।
শুধু তা-ই নয়, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীও (বিএসএফ) এখন থেকে কাজ করবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের অধীনে। অনেকেই ধারণা করছেন, বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফ যে প্রাণঘাতী অস্ত্র (লিথাল ওয়েপন) ব্যবহার না-করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সেটাও এবার পর্যালোচনা করা হতে পারে।
সীমান্তে গরু পাচার ঠেকাতে বিএসএফ কড়া ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে রাজনাথ সিংয়ের আমলেই। তার উত্তরসূরি এক্ষেত্রে আরও কঠোর অবস্থান নেবেন মনে করারও যথেষ্ঠ কারণ আছে বলেই পর্যবেক্ষকরা বলছেন। তাদের আশঙ্কা, এর চেয়েও বড় কথা, ভারত যাদের অবৈধ বিদেশি বলে মনে করছে তাদের ‘পুশব্যাক’ বা বাংলাদেশে জোর করে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা গত ৫ বছরে প্রায় শূন্যে ঠেকেছিল, অমিত শাহর আমলে সেই প্রবণতা আবার বাড়তে পারে।
এগুলোর কোনোটিই যে বাংলাদেশের জন্য স্বস্তিদায়ক নয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর এর কোনোটাকে কেন্দ্র করে দুদেশের সম্পর্কে কোনও উত্তেজনার আভাস দেখা দিলে তার নিরসনের ভার এসে পড়বে অবধারিতভাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের ওপর।
এখানে উল্লেখ্য, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন যখন (২০০৯-২০১৫ সাল) নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দফতরে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ছিলেন, ওই সময় ওয়াশিংটনে ভারতের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন এস জয়শঙ্কর। সেই সুবাদে তারা পরস্পরকে ঘনিষ্ঠভাবে চেনেন, এবং দুজনের কূটনৈতিক জীবনের ব্যক্তিগত পরিচয় এখন নিজ নিজ দেশের মন্ত্রী হিসেবেও কাজে দেবে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এস মোয়াজ্জেম আলীরও গুণমুগ্ধ জয়শঙ্কর। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে দুজনের মধ্যে বহুবার দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। মাসচারেক আগে ঢাকায় ভারতের নতুন রাষ্ট্রদূত রিভা গাঙ্গুলি দাসের সম্মানে হাই কমিশনার মোয়াজ্জেম আলী তার চাণক্যপুরীর বাসভবনে যে বিদায় সংবর্ধনার আয়োজন করেছিলেন, সেখানেও উপস্থিত ছিলেন সস্ত্রীক জয়শঙ্কর।
দিল্লির জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ অধ্যাপক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞ ইন্দ্রনাথ মুখার্জির কথায়, ‘অমিত শাহ একজন ধুরন্ধর রাজনীতিবিদ, আর জয়শঙ্কর সম্ভবত ভারতের সবচেয়ে অভিজ্ঞ কূটনীতিবিদ ও স্ট্র্যাটেজিস্ট।’
তিনি বলেন, “দুজনের এই ব্যাকগ্রাউন্ড মাথায় রাখলে হয়তো আমরা ধরেই নিতে পারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবেও অমিত শাহ ‘বাংলাদেশ তাস’ কারণে-অকারণে খেলতে চাইবেন। আর দেশের বাইরে সেটার ড্যামেজ কন্ট্রোলের দায়িত্ব যথারীতি এসে পড়বে জয়শঙ্করের ওপর!”

সূত্র : বাংলাট্রিবিউন

মন্তব্য করুন

Development by: webnewsdesign.com