অভিশপ্ত বেকারত্ব

শুক্রবার, ০৭ আগস্ট ২০২০ | ২:০৯ অপরাহ্ণ | 292 বার

অভিশপ্ত বেকারত্ব

হলুদ পাঞ্জাবি, খালি পা, গালে খুসখুসে দাড়ি, ঘুরে বেড়াচ্ছে শহরের অলিগলি, চেহারায় একটা উদাসীন ভাব, সে কে? সে হিমু।


কিন্তু, এই হিমু-কে কি শুধু বইয়ের পাতাতেই মিলে? আর কোথাও কি সে নেই?

ওই যে, বাড়ি থেকে মা প্রতিদিন বলছে, “কিরে, আর কতদিন বাপের পয়সায় চলবি। লেখাপড়া করাইলাম কেন? এখনো চাকরি করছ না! পাশের বাড়ির সুমন দেখ কত্ত বড় চাকরি করছে। তুই কিছু করছ না ক্যান? কতদিন পায়ের উপর পা তুলে খাবি?”

কিন্তু সে তো পায়ের উপর পা তুলে খায় না। রোজ বের হয় কাজের সন্ধানে। বাবা-মায়ের কাছে হাত পাতবে এই আত্মসম্মানে এক-ই জুতো তালি দিয়ে চালিয়ে দেয় বছর বছর। রোদে আর তপ্ত কঠিন রাস্তায় হেটে হেটে পায়ে ফোসকা পড়ে, গায়ের চামড়া জ্বলে, মাথার চুল, গালের দাড়ি বড় হয়, চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসে; কিন্তু সে পায়ের উপর পা তুলে খায় না। এখানে ওখানে কাজের খোজ করে। বড়সড় চাকরি থেকে শুরু করে একদম ছোটখাট কাজ অব্দি। লোক তাকে ছোটলোক ভাবে, উন্মাদ ভাবে, দীনবসনের কারনে নানান রকম উপেক্ষা ও অপমান সহ্য করে। তবু, নির্নিমেষ চুপচাপ।
বাসায় এসে লজ্জার সাথে বলে, “মা, ভাত দাও।”
মা বলে, “কোন ব্যাবস্থা হলো?”

সে নতমুখে বলে, “হয়ে যাবে, আর ক’টা দিন, আমি খুজছি।”

বাবা বলে, “আর কবে হবে? বয়স তো ছাব্বিশ পেরিয়ে গেল।”


সে কথা বলে না। চুপ করে শোনে, মা-বাবার চেহারার দিকে তাদের অলক্ষ্যে তাকায়।

সে কে? সে হিমু।

তার রূপা কোন কোন দিন তাকে ফোন করে বলে, “আজকে এসো নিরিবিলি রেস্টুরেন্টে। একসাথে একটু চা-সিঙ্গারা খাবো। দু-একটা কথা বলব।”

সে হ্যা ও বলতে পারেনা, না-ও বলতে পারেনা। বোঝাতে চায়, তাকে যেন সে ভুলে যায়, কিন্তু সে আর কিছু বলতে পারেনা।

সে আর চা খেতে যায় না। তার রূপা তাকে ফোন করে। তার জন্য অপেক্ষা করে। কিন্তু সে আসে না। তার রূপা রাগ করে। কিন্তু, তার ও যে না আসার পেছনে কারন আছে। সে বোঝাতে চায়, “আমি আর তুমি একে অপরের জন্য না, ভুলে যাও আমায়। আমি তোমার যোগ্য না। ক্ষমা করে দাও।”

তার ও ইচ্ছে হয়, হাতের পেছনে লুকিয়ে রাখা, লাল রঙের ওই কৃষ্ণচূড়া ফুলটা, ওর মাথায় লাগিয়ে দেয়। হাটতে হাটতে হঠাত তার সামনেই গাছ থেকে ঝরে পড়েছিল। সে সেটাকে তুলে নিয়েছিল৷ সযত্নে।
সেটাকে ফেলে দিবে এখন, কি লাভ আর এখন একে রেখে।

সে কে? সে হিমু।

হতাশা সইতে না পেরে সে সিগারেট খাওয়া শুরু করে। কেও কেও বলে, “তুমি সিগারেট খাচ্ছো! আশ্চর্য। তোমাকে ভাল ভাবতাম।”

সে কথা বলে না, হাসে। একটু পর বলে, “খারাপ হয়ে গেছি। বিভ্রান্তিকর উত্তর।”

কথাবার্তা যেন কেমন, কেও ঠিক বুঝে উঠে না। ভাবে, আজকালকার পোলাপানের মতিগতি ভাল না। ভাবে না, সে তো চেষ্টা করেছিল, দেখে না তার পেছনের উদাসীনতা।

বাড়িতে টিপ্পনি শুনতে আর ভাল লাগে না। ঠিকমত বাড়ি যায় না। রাতে বিরাতে ঘুরে বেড়ায়। একসময় নিজের সাথে আর রাস্তার ভিখারিদের সাথে কোন প্রভেদ পায় না। নিম্নবর্গের লোকের সাথে অচিরেই মিলে যায়। একসাথে পান-সিগারেট খায়। আনন্দ পায় সে। খুশি হয়।

হেমন্তের শেষে পাতা যেভাবে ঝরতে থাকে, তার জীবনের রঙিন স্বপ্নগুলোও এক এক করে ঝরতে ঝরতে সমস্ত আশা হারিয়ে মনে বৈরাগ্য জন্মে যায়। সার্টিফিকেট আর বায়োডাটা নিয়ে ঘুরে বেড়াতে আর ভাল লাগে না। সে এখন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়, উদাসীন হয়ে চলে, পান সিগারেট খায়, ফকির মিসকিনদের থেকে শুরু করে গুন্ডা-মস্তান সবার সাথে আড্ডা দেয়, মানুষের কথার উদ্ভট জবাব দেয়, আর সব কিছুতেই ঠাট্টা করে। আর কয়বছরে জীবন দূঃখ কষ্টে এমন হয়েছে, যে এখন কারো জন্ম-মৃত্যু, জরা-ব্যাধি কোনকিছুতেই আনন্দ-শোক কিছুই অনুভব করে না। মাঝে মাঝে তার রূপা ফোন করে আর বলে, “বাবা বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে, কিছু কর।”

সে কোন কথা না বলে ফোনটা কেটে দিয়ে প্যান্টের পকেটে রেখে দিয়ে দিব্যি আকাশের দিকে তাকিয়ে, শুক্লপক্ষের চাদ দেখতে দেখতে হেটে চলে, বিবর্ণ মুখটায় থাকে একটা ছোট্ট মুচকি হাসি, আর সে হাসিতে চাদের নীলচে আভা এসে মিইয়ে পড়ে।

এই প্রানহীন নগরে এমন হিমুর কোন অভাব নেই।

মন্তব্য করুন

Development by: webnewsdesign.com