নিসর্গপ্রহর

সোমবার, ০৮ জুলাই ২০১৯ | ৪:৪৩ অপরাহ্ণ | 268 বার

নিসর্গপ্রহর
মো. আবদুল মান্নান

ইদের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে দেশের সর্বত্র। আর এক রজনী বাদেই ইদ। আজ শেষ রমজানের ছুটির দিন বাংলোয় বসে অতিথিদের সাথে সাক্ষাৎ দেয়া আর ফাঁকে ফাঁকে বই বা সংবাদপত্রে চোখ রাখছি। সকাল থেকে এসবই করে যাচ্ছি। বাংলোর চারপাশটা ঘুরে দেখার একটা সুযোগও পেলাম আজ। এখন জ্যৈষ্ঠ মাস। আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, ছাড়াও কলা, পেঁপে, পেয়ারা, বেল, জামরুল, সফেদা, কামরাঙ্গা, জলপাইসহ অসংখ্য প্রকারের ফল ও ফুলের গাছে ভরপুর এ সরকারি স্থাপনা। চট্টগ্রামের ডিসিহিলে অবস্থিত বিভাগীয় কমিশনার এর বাংলো’র (Bungalow) কথা বলছি। ব্রিটিশ রাজদের ডিসিহিলের একটি অংশ হিসেবে এ বাংলো তৈরি করা হয়েছে সবে দু’হাজার সালের দিকে। ইতিহাসসূত্রে, মূলভবন অর্থাৎ ডিসি বাংলোর প্রতিষ্ঠা প্রায় ১৮৫০ সালের দিকে। ১৭৭২ সালের মে মাসে চট্টগ্রামে কালেক্টরের পদ সৃষ্টির মাধ্যমে তার আগমনের পর প্রথমে তিনি সরকারি মোহসীন কলেজ ক্যাম্পাসে দৃশ্যমান পর্তুগীজ ভবনে অবস্থান করেন এবং পরবর্তীতে এখানে তার স্থানান্তর। মোট ২১ একর জায়গার উপর বৃটিশ কোম্পানির শাসনামলে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ডিসি হিল’। যা আজোবধি দাঁড়িয়ে আছে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাহাড়ের টিলায় গাঢ় সবুজ বনানীতে বেষ্টিত এক মনোরম নৈসর্গিক আবাসন এন্টিকস্ হিসেবে।

ছুটির দিন বা সন্ধ্যায় কোন অতিথির সঙ্গে একান্তে বসে গল্প করার নিমিত্ত বাংলোর পূর্বাংশে গত বছর তৈরি করি একটি ছোট্ট ‘গোলঘর’। এক সাথে চার-পাঁচজন বসা যায়। প্রয়োজনে হালকা আপ্যায়নও সেরে নেয়া যায়। মাটি থেকে দু’তলা সমান উচুঁতে তুলে এটি করায় শহরের চারদিকটাও খন্ডিতভাবে দর্শন করা যায়। পহেলা বৈশাখ ১৪২৫ বঙ্গাব্দের অপরাহ্নে দু’পাশে গুবাক তরুর সারি লাগিয়ে ‘ওয়াকওয়ে’সহ এর শুভ উদ্বোধন হয়। আমি এর কাব্যিক নাম রাখি ‘নিসর্গপ্রহর’। এখানকার সবুজ গাছ-গাছালি আর নানা প্রজাতির পাখির কলরব-কোলাহল সব সময়ই আমার কানে বাজছে। ভাবি, আমি একা কী এ বাড়ির মালিক? পুষ্প, বৃক্ষ, বিহঙ্গ সবাই যে এর অংশীদার। প্রয়াত কথা সাহিত্যিক আহমদ ছফা তার বিখ্যাত “পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ” বইয়ে গাছ-পালা, কাকমন্ডলী, শালিক বা নানা প্রজাতির ছোট ছোট বৃক্ষের যেমন বর্ণনা দিয়েছেন সে মতে আমার বাংলোর চিত্রও তা’ই।

বাংলোর হরেক রকম ফলজ গাছগুলো একদিনে ফলবান হয়ে উঠেনি। বিভিন্ন সময়ে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারিগণ এসেছেন এবং একটি দু’টি করে লাগিয়ে গেছেন বিধায় আজ পরখ করে দেখছি, আমি নিজে যত ফলের নাম জানি এর প্রায় সবই এ বাংলোয় বহাল আছে। জানার অবশিষ্ট কিছু নেই। বলা হয়, বৃক্ষ যে রোপন করে সে ভোগ করে খুব অল্প। পুষ্পও আপনার জন্য ফোটে না। আর বিহঙ্গরা প্রকৃতির চির অপেক্ষমাণ প্রহরীর মত। যেন সবাই নিবেদিত প্রাণে করেছে মহত্বের জয়গান। জ্ঞানীরা বলেন, ফলহীন বৃক্ষে পাখি বসে না। এ কারণেই বোধ করি এখানে সবার মিলন মেলা।

হেঁটে হেঁটে দেখছি, কাঁচা-পাকা আম ঝুলে আছে ডাল ভর্তি। তারা ফলাবনত হয়ে মাটিকে স্পর্শ করতে চাচ্ছে। কাঁঠালগুলো গাছেই পেকে আছে। অন্যান্য ফলও বার মাস ধরছে এবং প্রাকৃতিক ভাবেই পেকে, মজে মাটিতে মিশে যাচ্ছে। আমরা যেমন খাচ্ছি, কিছু চতুষ্পদ প্রাণী এবং দেশি বিহঙ্গরাও নির্ভয়ে তা খাচ্ছে। নির্ভয়! কারণ, এরা ভাবছে বাড়ির এসবের প্রকৃত মালিক তারাই। কখনো পাই, কিছু ফল তারা টেস্ট করে দিয়েছে আমরা পরে শেষ করছি। আমরা এদের তাড়াতে গেলে যেন এরা প্রতিবাদ করে সমস্বরে চিৎকার করতে করতে জবাব দেয়, এ পাহাড়ের এ জনমের আমরা কী কেউ নই? আপনিই কী সব? কবে এসেছেন, ক’দিন আছেন? আমরা কিন্তু প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে এখানে বসবাস করে আসছি। যদি বলেন, পুরুষানুক্রমে আমাদের অধিকার অনেক বেশি। আমাদের অবজ্ঞা, অবহেলা করা চলবে না ইত্যাদি ইত্যাদি……..।

এর প্রমাণ, কোন একটি ফলবান বৃক্ষকে সুরক্ষা দেয়ার জন্য কখনো যদি জাল দিয়ে আটকানো হয় বা টিনের ঘন্টি লাগিয়ে এদেরকে ভয় প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়, এতে তারা ভীষণ বিরক্ত ও সংক্ষুব্ধ হয় কখনো বা প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে উঠে। এমন কি এদের সভা-সেমিনার করার দৃশ্যও আমার নজরে আসে। সম্প্রতি বাংলোর নাজির পাকা লিচু রক্ষার জন্য একটি গাছে চমৎকারভাবে নেটিং করে আমাকে দেখালো। বললো, এবার আর এরা কোন কিছুই করতে পারবে না। দু’দিন পর আমি লক্ষ করছি, নেট থাকলেও সংখ্যাগুরু কাকদের নেতৃত্বে অন্যান্য পাখিরাও একাত্ম ঘোষণা করে ভেতর থেকে ঢুকে অত্যন্ত নৈপুন্যের সাথে গাছটি শূন্য করে দিয়ে যায়। জানতে পারি, পূর্ববর্তী বছরগুলোতে দু’চারটি লিচু পাওয়া গেলেও এ বছর এরা একটিও আমাদের জন্য রাখেনি।

মাঝে-মধ্যে যদি আমি, বাংলোর নাজির এবং অন্যান্য স্টাফদের বৃক্ষরাজি ও ফলফলাদি রক্ষার বিষয়ে কিছু পরামর্শ দেই তখন তারা গাছের মগডালে বসে আড়াল থেকে যেন সবই শুনে এবং সে ভাবেই প্রস্তুতি গ্রহণ করে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, বাংলোর সকল বৃক্ষের ওপরের অংশের পূর্ণ মালিকানা বিহঙ্গ সমাজের হাতে প্রায় চলে গেছে। নিচের অংশে দিনের পূর্বাহ্নে কতিপয় বেওয়ারিস সারমেয় এবং রাতে অতিথি শিয়ালদের অনধিকার প্রবেশ সম্মিলিতভাবে রুখে দিয়ে তারাই একক কর্তৃত্ব করছে।

হেন পরিস্থিতিতেও আমার সামান্য উদ্বিগ্ন হওয়া বা বিচলিত বোধ করার কোন কারণ নেই। মা প্রকৃতি প্রতিদিন সব কিছু উদার হাতে দান করে যাচ্ছে। এ দান যে শুধুমাত্র বিশেষ কোন শ্রেণি বা প্রজাতি বা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে তা একেবারই সত্য নয়। সকল সৃষ্টির জন্যই স্রষ্টার এমন অপার নিয়ামত। এগুলোর ওপর সকল প্রাণিকুলের অস্তিত্ব, জীবন-জীবিকা তথা অধিকার রয়েছে। এ অধিকার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত করা যায় না। কাউকে প্রবলভাবে বঞ্চিত করা মানে প্রকৃতি তার নিজের আইন নিজের হাতে তুলে নিবে। তখনি ঘটে যতসব বিপত্তি আর দুর্ভোগ। আমরা বরং প্রকৃতির দেয়া এমন আশীর্বাদগুলোকে অকৃপণভাবে গ্রহণ এবং বরণ করতে পারি। একই সাথে বিলিয়ে দিতে পারি সকল প্রাণিদের মাঝে। আর সবাই মিলে বেঁচে থাকার নামই জীবন। আহমদ ছফা তার বইটির শেষাংশে এসে বলেছেন, “এই পুষ্প, এই বৃক্ষ, তরুলতা, এই বিহঙ্গ আমার জীবন কানায় কানায় ভরিয়ে তুলেছে, আমার মধ্যে কোনো একাকীত্ব, কোনো বিচ্ছিন্নতা আমি অনুভব করতে পারিনে। সকলে আমার মধ্যে আছে, আমি সকলের মধ্যে রয়েছি”।

আমার বাংলোতেও নানা জাতের মৌসুমি ফল-ফুল-পুষ্প-তরুলতা প্রকৃতির নিয়মেই ফলবতী হউক এবং বিহঙ্গের ঠোঁট থেকে অনবরত ঝরে পড়ুক। ফুল ফুটুক, মৌ-মৌ গন্ধ ছড়াক। পরম্পরায় আমরা সকলই এর স্বাদ-গন্ধ-সৌন্দর্য্য উপভোগ আর অবলোকন করে বেঁচে থাকি।

লেখক-
মো. আবদুল মান্নান
বিভাগীয় কমিশনার, চট্রগ্রাম বিভাগ
( লেখকের ফেসবুক থেকে লেখাটি নেওয়া)

মন্তব্য করুন

Development by: webnewsdesign.com