দুর্নীতি নয়, নওয়াজের পরিণতির নেপথ্যে সেনা বিরোধিতা!

মঙ্গলবার, ১৭ জুলাই ২০১৮ | ৮:৩৪ অপরাহ্ণ | 16 বার

দুর্নীতি নয়, নওয়াজের পরিণতির নেপথ্যে সেনা বিরোধিতা!

পানামা পেপারস দুর্নীতিকে কারণ দেখিয়ে ২০১৭ সালের জুলাইয়ে নওয়াজকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অযোগ্য ঘোষণা করে পাকিস্তানের সর্বোচ্চ আদালত। লন্ডনে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ক্রয়সংক্রান্ত দুর্নীতির কারণে তাকে দেওয়া হয় কারাদণ্ড। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব দুর্নীতি নয়, নওয়াজের পরিণতির কারণ সেনা বিরোধিতা। ১৯৯৯ সালে তৎকালীন সেনাপ্রধান পারভেজ মোশাররফকে বরখাস্ত করার মাধ্যমে যার সূচনা করেছিলেন নওয়াজ। সেনাবাহিনীর নওয়াজবিরোধী ভূমিকাও কারও অজানা নয়। সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক প্রধানমন্ত্রিত্বে অযোগ্য ঘোষণা করার পর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে সেনাবাহিনীর নওয়াজবিরোধী অবস্থানের কথা উঠে আসে। অল্প কিছু দিনের মাথায় নওয়াজ শরিফের সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে সেনাবাহিনীর রোষের মুখে পড়ে দেশটির সবচেয়ে প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ডন। সবশেষ দুর্নীতির মামলায় সাজা ঘোষণার পর দেশে ফিরেও সেনাবাহিনীর রোষের শিকার হয়েছেন নওয়াজ।
পানামা পেপারস কেলেঙ্কারির ঘটনায় নাম থাকায় পরিবারের সম্পদ নিয়ে তদন্তের পর গত বছরের ২৮ জুলাই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে প্রধানমন্ত্রীর পদে অযোগ্য ঘোষণা করেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। অপ্রদর্শিত সম্পদের কারণেই সুপ্রিম কোর্ট পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ বা পিএমএল-এন’র নেতা নওয়াজের বিরুদ্ধে রায় দেন। রায়কে পক্ষপাতদুষ্ট আখ্যা দেয় পিএমএল-এন। তবে প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ডন সে সময় জানায়, নওয়াজবিরোধী অবস্থান থেকেই গত মার্চে নির্দিষ্ট কিছু সাংবাদিককে ডেকে নিয়ে ব্রিফিং করেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া। রাওয়ালপিন্ডির সেনা সদর দফতরে ওই ব্রিফিংয়ে অন্তত ৩০ জন সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, টিভি উপস্থাপক ও সংবাদমাধ্যমের মালিক উপস্থিত ছিলেন। সেখানে উপস্থিত থাকা একজন জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে এশিয়া টাইমস’কে সে সময় জানিয়েছিলেন, সেনাপ্রধান সোজাসুজি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন।

পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত মার্কিন কলামিস্ট মোহাম্মদ তাকি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়্যার-এ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে লিখেছেন, পানামা পেপারস ফাঁসের পর নওয়াজের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া বর্তমান মামলাটি পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর ভাগ্যকে সুপ্রসন্ন করেছে। ফাঁস হওয়া নথি অনুযায়ী সাবেক এ প্রধানমন্ত্রীর সন্তানদের নামে অফশোর কোম্পানির মালিকানা দেখা গেলেও সেখানে তার নাম উল্লেখ করা ছিল না। তা সত্ত্বেও পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট যথোপযুক্ত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ট্রায়াল কোর্ট গঠন এবং পানামা পেপারস নিয়ে নওয়াজের বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করলো। তার ওপর তাকে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করার সুযোগ দিতে অস্বীকৃতি জানানো হলো। পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট নওয়াজের বিরুদ্ধে অপরাধের কোনও প্রমাণ পেলো না। তখন তার আয়ের উৎস গোপন করাজনিত একটি তুচ্ছ অভিযোগ দায়ের করা হলো। নওয়াজের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে সেনাবাহিনীর ইশারাতেই যে সুপ্রিম কোর্ট কাজ করেছে, সে ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই বললেই চলে।

লন্ডনে কেনা বিলাসবহুল চারটি ফ্ল্যাটের মূল্য পরিশোধে দেওয়া অর্থের উৎস দেখাতে ব্যর্থ হওয়ার দায়ে ৬ জুলাই নওয়াজ শরিফ আর তার মেয়ে মরিয়মকে কারাদণ্ড দেয় আদালত। রায় ঘোষণার সময় লন্ডনে অবস্থানরত পিতা ও কন্যা শুক্রবার দেশে ফিরেই গ্রেফতার হন। নাম প্রকাশ না করা শর্তে একজন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশ ও নওয়াজের নিজের নির্বাচনি এলাকা পাঞ্জাবের পুলিশ কর্মকর্তাদের সামরিক ও গোয়েন্দা বাহিনীগুলোর পক্ষ থেকে পিএমএল-এন নেতাকর্মীদের গ্রেফতারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া দলটির বিভিন্ন কর্মসূচিতে বাধা দেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

দ্য ওয়্যার-এ প্রকাশিত বিশ্লেষণে কলামিস্ট মোহাম্মদ তাকি এই দুর্নীতির প্রসঙ্গে লিখেছেন, নিজের ভাগ্য গড়াটাই নওয়াজের মূল অপরাধ নয়, তার অপরাধ হলো সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক ভাগ্যকে চ্যালেঞ্জ করা। এর শুরুটা হয়েছিল ১৯৯৯ সালে। সে সময় জেনারেল পারভেজ মোশাররফকে বরখাস্ত করেছিলেন তিনি। এরপর বদলা হিসেবে পারভেজ মোশাররফের নেতৃত্বাধীন এক সেনা অভ্যুত্থানে নওয়াজ ক্ষমতাচ্যুত হন। আর তার প্রতিশোধ নিতে ২০১৩ সালে নওয়াজ ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় পারভেজ মোশাররফকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। নওয়াজ সরকার সাবেক স্বৈরশাসককে বিচারের মুখোমুখি করার পরপরই এটা স্পষ্ট হয়ে যায়, সেনাবাহিনী শুধু তার প্রতিটি পদক্ষেপই অনুসরণ করবে না, জোরালোভাবে তার পিছু নেবে। সেনাবাহিনী নওয়াজ শরিফকে তাদের আজ্ঞাবহ মনে করেছিল। কিন্তু নওয়াজ প্রকাশ্যে তাদের হুমকি দিলেন, কার্গিলের পতন নিয়ে তিনি সেনাবাহিনীর ভূমিকা তদন্ত করবেন। তিনি বলেছেন, অ্যাকাউন্টেবিলিটি কোর্টের রায়টি আগে থেকে নির্ধারিত ছিল। দেশটির ইতিহাস ঘাঁটলেই দেখা যায়, যারাই সামরিক শাসনের বিরোধিতা করেছে তাদেরকেই ভয়ঙ্কর বিচার ও নিপীড়নের শিকার হতে হয়েছে। আর সেনাবাহিনীর বেসামরিক সহযোগীরা মুক্তভাবে চলাচল করেছে।

মোহাম্মদ তাকি তার বিশ্লেষণে আরও বলেন, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ইন্টার-সার্ভিসেস ইনটেলিজেন্স ডিরেক্টরেট (আইএসআই) সর্বপ্রথম ২০১৪ সালে নওয়াজ শরিফের বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক অভ্যুত্থান প্রচেষ্টায় সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেছিল। ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া ইমরান খান ও ধর্মীয় নেতা তাহির উল কাদরিকে একত্রিত করতে পেরেছিল তারা। ২০১৩ সালের নির্বাচনের এক বছর পরই কারচুপির অভিযোগ এনে পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএলএন) সরকারকে উৎখাত প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ইমরান খান ও তাহিরের নেতৃত্বে প্রাদেশিক রাজধানী অবরোধ করা হয়েছিল। সে সময় অন্য বিরোধী দলগুলো পিএমএল-এন এর পক্ষ নিয়েছিল এবং সেনা-ইমরান-কাদরির যৌথ প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়েছিল।

রাজনৈতিক বিরোধীদের দমাতে পাকিস্তানে প্রথম যে আইনটি চালু হয় তা হলো পাবলিক রিপ্রেজেন্টেটিভ অফিসার্স ডিসকোয়ালিফিকেশন অ্যাক্ট (পিআরওডিএ) ১৯৪৯। তবে ১৯৫৯ সালের আগস্টে প্রথম সেনা শাসক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান প্রণীত ইলেক্টিভ বডিজ ডিসকোয়ালিফিকেশন অর্ডার নামক আইনের আওতায়ও আরও কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়। এ আদেশের আওতায় বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক নেতাকে আট বছর রাজনীতিতে নিষিদ্ধ করা হয়। ওই আদেশের আওতায় বাঙালি নেতা শহীদ সোহরাওয়ার্দীকেও পড়তে হয়েছিল। মোহাম্মদ তাকি মনে করেন, নওয়াজ শরিফের মতো সোহরাওয়ার্দীও সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রকে পায়ে ঠেলেছেন এবং মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনিও একই সারমর্মে উপনীত হয়েছিলেন, পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে শান্তি চাইলে বেসামরিক কর্তৃত্বের ওপর জোর দেওয়া জরুরি।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ফার্স্টপোস্টের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রেফতার হওয়ার আগের কয়েক দিন ধরে নওয়াজ সেনা নেতৃত্বকে আক্রমণ করে কথা বলেছেন। তিনি তাদের খালাই মাখলুক বা ভিনগ্রহের প্রাণী হিসেবে অ্যাখ্যা দিয়ে থাকেন। তবে প্রথমবারের মতো লন্ডনের সংবাদ সম্মেলনে তিনি গোয়েন্দা বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করেন। ওই কর্মকর্তা পিএমএল-এন‘র নির্বাচনি প্রার্থীদের নির্বাচন না করার অথবা দলীয় আনুগত্য পরিবর্তনের জন্য চাপ দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন নওয়াজ।

সাংবাদিক ও বেসামরিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনকর্মী গুল বুখারি মনে করেন, নওয়াজের দল পিএমএল-এন’কে রুখতে সেনাবাহিনীর অব্যাহত প্রচেষ্টা জারি রয়েছে। আরেক স্বনামধন্য সাংবাদিক ও বিশ্লেষক মুবাশি জাইদিও মনে করেন, দলটি এখন সামরিক বাহিনীর কাছ থেকে ভয়ঙ্কর চাপের মুখে আছে।

মন্তব্য করুন

Development by: webnewsdesign.com